সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সহায়তা করেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন কোথায়? ছোটকালে এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জেগেছিলো। ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস সংক্ষেপে ইউএসএসআর (USSR) গঠনের পেছনে অনেক বিপ্লব, যুদ্ধ জড়িয়ে আছে৷ আজকে সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান নিয়ে আলোচনা করবো।

শত শত বছর ধরে রাশিয়াকে যেসব রাজারা শাসন করতো, তাদের উপাধী ছিলো ‘জার’। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস শুরু হয়েছিলো জারদের শাসনের অবসানের মাধ্যমে৷

বিশ শতকের শুরুর দিকে রাশিয়া কয়েকটি যুদ্ধে ভয়াবহ পরাজয় বরণ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – রুশ-জাপানিজ যুদ্ধ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে পরাজয় ও সর্বশেষ জার নিকোলাসের অত্যাচারী শাসনে বাম দলগুলোর মধ্যে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে৷ বিপ্লবী বাম দলগুলো সমাজের এলিট শ্রেণির অবসান ঘটিয়ে শ্রমিক শ্রেণির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো। এই বিপ্লবী দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বলশেভিক। বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন ভ্লাদিমির লেনিন। ১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লব। এই বিপ্লব দুই ধাপে সংঘটিত হয়। প্রথম ধাপে ১৯১৭ সালে বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শীরা দ্বিতীয় জার নিকোলাসকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করতে সক্ষম হয়। বলা হয়, এই বিপ্লবের মাধ্যমেই পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গিয়েছিলো। এরপরের ধাপে রাশিয়ার অন্তবর্তীকালীন সরকারকে সরিয়ে স্থানীয় শ্রমিক শ্রেণিকে ক্ষমতায় বসানো হয়। ক্ষমতায় বসানো এসব শ্রমিককে ‘সোভিয়েত’ বলা হতো। ১৯১৮-১৯২০ সাল পর্যন্ত সাবেক জারের অনুগত সাদা দল এবং বিপ্লবী লাল দলের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলে৷ গৃহযুদ্ধে লাল দল বিজয়ী হলে, ১৯২২ সালে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে একত্রিত হয়ে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস (USSR) গঠিত হয়।

১৯২২ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির (তৎকালীন বলশেভিক পার্টি) প্রধান ভ্লাদিমির লেনিন সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করে। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই চুক্তি সম্পন্ন হয়৷

প্রথম দিকে রাশিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান মিলে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় পাশাপাশি অন্যান্য দেশেরও সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির জন্য নমনীয় নীতি বজায় রাখা হয়ছিলো। ফলে ১৯৪০ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ এর কোটায়। দেশগুলো ছিলো– বর্তমান রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, মালদোভা, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান।

এবার আসি লেনিনের শাসন নিয়ে। লেনিন ক্ষমতায় এসে সর্বপ্রথম দেশের শিল্পগুলোকে জাতীয়করণ করে৷ সেই সাথে নাগরিকদের মধ্যে জমি বন্টন করে দেওয়া হয়। আর যারা লেনিনের বিরোধিতা করেছিলো, তাদের কাউকে হত্যা করা হয় কিংবা কারাগারে পাঠানো হয়। সে সময় বন্দিদেরকে ‘রেড টেরর’ নামক এক বন্দিশালায় আটকে রাখা হতো। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই বছরের মধ্যে ভ্লাদিমির লেনিন মারা যান। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন লেনিনের যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বকে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে৷ এই রাজনৈতিক আদর্শ মার্ক্সীয়-লেনিনবাদ নামে পরিচিত হয়। যা মূলত কমিউনিজমেরই একটি ধারা।

লেনিনের মৃত্যুর পরে আরেকজন বলশেভিক বিপ্লবী জোসেফ স্তালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতায় আসে৷ লেনিনের সাথে স্তালিনের কিছু গুরুতর বিষয়ে মতবিরোধ ছিলো। লেনিনের সাথে এসব মতপার্থক্য গোপন করে স্তালিন নিজেকে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। দেশকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি বানাতে, স্তালিন দ্রুত শিল্পায়নে মনযোগ দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্তালিনের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো সফল হলেও, এই সফলতাগুলো এতো সহজে আসেনি। সেসময় লাখ লাখ মানুষকে অন্যায়ভাবে ‘গুলাগ’ নামের লেবার ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিলো। আশ্চর্যজনকভাবে দেশের অর্থনীতির বিরাট অংশ এই লেবার ক্যাম্প থেকেই আসতো৷

মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কারণে সেসময় দশ লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলো। সমাজতন্ত্রে উৎপাদিত ফসল রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সে কারণে নিজেদের উৎপাদিত ফসল থাকা সত্ত্বেও, কৃষি শ্রমিকরা পর্যাপ্ত খাবার পেতনা৷

১৯৩০ সালে স্তালিন ‘গ্রেট পার্জ’ নামে অভিযান পরিচালনা করে৷ এই অভিযানে সমাজতন্ত্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে অনেক বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়, আবার কাউকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, স্তালিন নাৎসি জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তি করে। ১৯৪১ সালে জার্মানি শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে রাশিয়া আক্রমণ করে৷ সে সময় স্তালিন লাখ লাখ সৈন্যকে মৃত্যুমুখে পাঠিয়েও নাৎসি আক্রমণকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্তালিন সরকার বিশ্বের অন্যান্য দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে অর্থায়ন করতে শুরু করে। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পরে দেশটি স্তালিনকে জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কারন সে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নাৎসি আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে শিল্পায়নের যুগে নিয়ে এসেছিলো। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ গঠনেও ভূমিকা রাখেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসের এই সময়ে স্তালিনের নেতৃত্বে প্রচলিত রাজনৈতিক মতবাদ “স্তালিনবাদ” নামে পরিচিত। অনেকের মতে, স্তালিনের এই সময়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিলো। এই হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থানের ইতিহাস।

 


সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ,
৪৯ তম আবর্তন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *