মানব তুমি জীবন্ত পুতুল!

বর্তমান বিশ্বে করোনা ভাইরাস যনে তান্ডব নৃত্য করছে। ওয়ার্ল্ডওমিটারসের তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত করোনায় প্রাণ হারিয়েছে সাড়ে আট লাখের বেশি মানুষ এবং আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই কোটি ছাড়িয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হচ্ছে এবং এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, সৃষ্টিকর্তা যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন। তাঁর লীলা বোঝা বড় দায়।
মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি চন্ডীদাস মানুষের জয়গান গেয়েছেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই; সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ মানুষই আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। পৃথিবীর সব কিছু মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কোথায় কোন মানুষ জন্মাবে, তার কিভাবে মৃত্যু হবে, এক কথায় সবকিছু সৃষ্টিকর্তা কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন এবং কোথাও কোন ত্রুটি নেই। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, রিজিক এসবই সৃষ্টিকর্তার হাতে ও পূর্ব নির্ধারিত। ধর্মগ্রন্থে এমন কথাই বলা আছে।

ছেলে বাবার দুই পা চেপে ধরে, মেয়ে ধরে দুই হাত, আর মা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে স্বামীকে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরে পরকীয়ায় জড়িত এমন সন্দেহে নৃশংস এ ঘটনাটি ঘটেছে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেছেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্ম গ্রহণ করে, কিন্তু সর্বত্রই তাকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।’ এ শৃঙ্খল সম্ভবত মানুষের কর্মে, তার নিয়তির কাছে। সঞ্জীবচন্দ্র পালামৌ’তে অভিমত দিয়েছেন ,‘ যাহার ভাগ্যে কঠিন পাষাণ, পাষাণই তাহার অবলম্বন।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য় মানুষকে পুতুলের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘সংসারে মানুষ চায় এক হয় আরেক; চিরকাল এমনি দেখে আসছি। পুতুল বই তো কিছু নই আমরা। একজন আড়ালে বসে চালাচ্ছেন।’ এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শশীর সঙ্গে প্রায় দশ বছরের প্রেম পরানের বৌ কুসুমের। কুমুস শশীকে ছেড়ে চলে যাবে বাপের বাড়ি। হঠাৎ কুসুমের মনে শশীর সঙ্গে না পালানোর অভিপ্রায় কেন উদয় হলো সেই হতাশায় শশী মৃদু হেসে বলছে, তাঁকে (ভগবান) একবার হাতে পেলে দেখে নিতাম। কুসুমের বাপ অনন্ত শশীকে বলে, তেমন করে চাইলে পাবেন বই-কি, ভক্তের তো দাস তিনি। আমাদের স্বার্থে টান পড়লেই কেবল ভগবানকে ডাকি কিনা! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘মরীচিকা’ কবিতায় উল্লেখ করেছেন,‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না। বক্ষ হইতে বাহির হইয়া আপন বাসনা মম, ফিরে মরীচিকা সম।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গীত রচনা করেছেন, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশু আনমনে। প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা, নিরজনে প্রভু নিরজনে। নিত্য তুমি হে উদার, সুখে দুঃখে অবিকার।’ অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি লিখেছেন,

‘আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব-সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত; আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কিপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না।

বিশ্বে বর্ণবৈষম্য, সংখ্যালঘু নির্যাতন, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার যেদিন বন্ধ হবে; ফিলিস্তিন, কাশ্মির, বেলুচিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, আফগানিস্তান, হংকং, চীনের উইঘুর সম্প্রদায়, মিয়ানমারের রাখাইনের রোহিঙ্গাসহ বিশ্বের উৎপীড়িতের ক্রন্দন যেদিন থেমে যাবে। দেশে দেশে শাসকের শোষণ যেদিন উঠে যাবে কবি সেই দিনই কেবল শান্ত হবেন। কিন্তু অত্যাচারীর খড়গ চালনা কিংবা উৎপীড়িতের ক্রন্দন তো বন্ধ হবার নয়। এসব তো সভ্যতার চালিকা শক্তিরই অংশ। তাই সাম্য ও বিদ্রোহের কবি ক্ষেপে গিয়ে ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে চেয়েছেন ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেই পদ-চিহ্ন; আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!’

‘মেমসাহেব’ উপন্যাসের মেমসাহেব ও সাংবাদিক বাচ্চুর দীর্ঘ প্রণয় শেষে যখন পরিণতি আসন্ন। দিল্লীর গ্রীন পার্কে ছোট্ট একটি বাসায় তাদের স্বপ্নের সংসার গুছানো প্রায় সম্পন্ন; ফাল্গুনে বিয়ের দিন ধার্য। ঠিক তার কয়েকদিন পূর্বে এক দুর্ঘটনায় মেমসাহেব এর মর্মান্তিক মৃত্যু হলো। বাচ্চু তার প্রেয়সীর প্রেরণায় শূন্য থেকে সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন। তারা তো কারো ক্ষতি করে নি, কারো অমঙ্গল কামনা করে নাই। দুর্নীতি করে নাই। কেবল ভালোবেসে সংসার পাততে চেয়েছিল। তাদের এতো সুখ বুঝি ভগবানের সইলো না!

নিমাই ভট্টাচার্য তাঁর ‘মেমসাহেব’ এ হবু বধূয়াকে হারিয়ে শোকে বিহŸল সাংবাদিক বাচ্চুর মাধ্যমে ভগবানের সমালোচনা করেছেন ,‘মাঝে মাঝে মনে হয় কালাপাহাড়ের মত ভগবানের সংসারে আগুন জ্বালিয়ে দিই। মনে হয় মন্দির-মসজিদ-গির্জাগুলো ভেঙে চুরমার করে দিই! আমাদের মতো অসহায় মানুষদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার ভগবানকে কে দিল? মায়ের কোল থেকে একমাত্র সন্তানকে কেড়ে নেবার অধিকার কে দিয়েছে ভগবানকে। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের পাকা ধানে মই দেবার সাহস ভগবানের এলো কোথা থেকে?’

আবার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ তে বস্তুবাদী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘জেলেপাড়ার ঘরে শিশুর ক্রন্দন কোন দিন বন্ধ হয় না। জন্মের অভ্যর্থনা এখানে গম্ভীর, নিরুৎসব, বিষণœ। জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সংকীর্ণতায়। ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে। এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ এদিকে দার্শনিক ভলতেয়ার এর অভিমত , ‘ঈশ্বর না থাকলে তাকে বানানো হতো কিন্তু প্রকৃতি বলছে ঈশ্বর আছে।’

মহান দার্শনিক সক্রেটিস বলে গেছেন , ‘নিজেকে জানো। প্রকৃত জ্ঞান নিজেকে জানার মধ্যেই। আর মৃত্যুই হলো মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় আর্শীবাদ।’ অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দার্শনিকের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন এই বলে,‘জগতে প্রত্যক্ষ সত্য বলে যদি কিছু থাকে, তবে সে মরণ। মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে ।’

বি.এস.এস (অনার্স), সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *