বিচারহীনতা কী ধর্ষণের অন্যতম কারণ!

রূপা,তনু, নুসরাত, পূর্ণিমা- নামগুলো খুব পরিচিত লাগছে তাই না? কোথায় যেন শুনেছেন শুনেছেন মনে হচ্ছে! জ্বী এগুলো সব ধর্ষিতার নাম। এমন হাজারো তনু, হাজারো নুসরাত আজও প্রতিনিয়ত ধর্ষিতার খাতায় নাম লিখে চলেছে।

মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে পড়ে নিশ্চয়ই! সে সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের নানা অপকর্মের ভিতর যে অপরাধটা আমার-আপনার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে সেটা হলো ধর্ষণ। চিন্তা করুনতো নিজের মা, বোন, নিকট আত্নীয়কে ধর্ষণ করা হয়েছে এটা নিজের কাছে কতটা কষ্ট ও বেদনার ঘটনা হতে পারে? সেসময়ের পরাধীন রাষ্ট্রের চেয়ে বর্তমানে এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন দেশে ধর্ষণ এক মহামারী রূপ নিয়েছে।

প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায়, রেডিও, সংবাদপত্রে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভেসে আসে নানা অপকৌশলে ধর্ষণের খবর। অমুক রাস্তার পাশে ধর্ষণ, বাসের ভিতর দলগত ধর্ষণ, মন্দিরের ভিতর ধর্ষণ, মসজিদের ভিতর ধর্ষণ, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গাগুলোতেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন আমাদেরই মা-বোন আমাদেরই হাতে। যখন শুনি বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষণ তখন স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে নারীর নিরাপদ আশ্রয় তাহলে কোথায়?

তিন বছরের অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধা, ১৮ বছরের যুবতী থেকে শুরু করে চার সন্তানের জননী, গার্মেন্টস কর্মী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বাদ পড়ছেন না কোনো শ্রেণির কোনো পেশার কোনো বয়সেরই কেউ? এ জাতির এত অধঃপতন কেনো? কীভাবে?

বিচারহীনতা! নৈতিক অবক্ষয়! সামাজিক মূল্যবোধের অভাব! ক্ষমতার অপব্যবহার! মাদকের আখড়া! পর্ণোগ্রাফির অবাধ প্রসার! এরকম হাজারটা কারণকে আপনি চাইলেই খুঁজে বের করতে পারবেন।
তবে এসবের পিছনে আরেক যাদুকরী মন্ত্রের বীজ আপনার আমার মধ্যে এই সমাজ বপন করে দিয়েছে, সেটা হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষই কর্তা নারী স্রেফ অবলা। স্বভাবতই এইসমাজ নারীদেরকে হেও করে দেখে, ছোট করে দেখে, তাদেরকে মানুষ হিসেবে দেখতে পারে না বা মানতে পারে না। যদি নারীদেরকেও মানুষ হিসেবে মানতে পারতো তবে কোনো নারী ধর্ষণের মত বর্বরতার শিকার হতো না। কেউ ধর্ষিত হলে আমাদের মস্তিষ্কে সবার আগে এই প্রশ্ন আসতো না যে তাঁর পোশাকের সমস্যা ছিল, একা কেনো ঘুরতে গেলো, রাত-বিরেত কেনো বাইরে গেল ইত্যাদি। মানে এই সমাজ ঘুরে ফিরে ওইসব ধর্ষিতার দিকেই আঙ্গুল তুলে দোষ চাপাতে চায়, কারণ তারা নারী।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি এদেশের কাঁধে ভূতের মত আঁকড়ে ধরেছে বহুবছর হলো। সাধারণত যারা ধর্ষণ করে তারা বেশিরভাগই হয় রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পন্ন নতুবা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, অন্যদিকে যারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন তাদের চিত্র বিপরীত। সাধারণত খেটে খাওয়া নিরীহ পরিবারের মেয়েগুলো ধর্ষণের শিকার হন। তার উপর আছে দেশে ১৮০ বছরের পুরাতন বৃটিশ আইন, যার আইনী প্রক্রিয়া অনেক সময়সাপেক্ষ ও জটিলতায় পরিপূর্ণ। অনেক সময় নিরীহ ওইসব পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না আদালতে মামলা পরিচালনার। পুলিশের অসহযোগিতা ও হয়রানি এবং রাজনৈতিক নেতাদের হুমকি ধামকিতে অনেক সময় মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এমনটা কী হওয়ার কথা ছিল? দেশ কি নষ্টদের দখলে দেওয়ার জন্য স্বাধীন করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা।

আবার দেখুন পৃথিবীর অনেক দেশে ধর্ষণের শাস্তি কঠোরতর হলেও আমাদের দেশ সেক্ষেত্রে অনেকটা পশ্চাৎপদ। যেমন চীনের কথাই ধরুন, তাদের দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, সৌদি আরব, মিশরসহ অনেক দেশে জনসম্মুখে শিরশ্ছেদ করা হয়ে থাকে। উত্তর কোরিয়াতো রীতিমতো ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। সম্প্রতি পাকিস্তানেও ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে ফাঁসির বিধান করা হয়েছে। সেখানে আমাদের দেশে ধর্ষণের পর হত্যা না হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি।

ধর্ষণ রুখতে কঠোর আইন প্রণয়ণের পাশাপাশি বিচার-প্রক্রিয়া সহজতর করে উপর্যুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাথে সাথে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে।

সরকারের পাশাপাশি জনসাধারণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই সমাজ থেকে ধর্ষণ নামক ব্যাধি দূর করতে।


সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ
৪৯তম আবর্তন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *