দেহহীন অস্তিত্ব

নিতুর সাথে তার মায়ের সম্পর্ক টা অত্যন্ত বাজে। বর্তমানে মা-বাবার সাথে সন্তানের দুরত্বটা যেন স্বাভাবিক, মা-বাবা সেকেলে, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, কনজারভেটিভ, আরো কত্তো কি! নিতু ছিলো চুপচাপ মেয়ে, মা বা কারো সাথে কিছু শেয়ার করতো না। এর জন্যও তার মাকে অপরাধী মনে হতো। মনে হতো তার মা কেন বাকি সব মায়েদের মতো না। কখনো সেই জায়গাটুকু তার মা তার জন্য করে দেয়নি যে হাসি-সুখ-কান্না বা সবকিছু মায়ের সাথে শেয়ার করবে, সদ্য তার ভালোবাসার মানুষটাকে তার কাছ থেকে সরিয়ে নেয় তার মা।
নিতু শাহেদকে অনেক ভালোবাসতো। তার হাসি-কান্নার সঙ্গী ছিলো শাহেদ। তার পৃথিবীতে শাহেদই সব ছিলো। শাহেদও নিতুকে ভালোবাসতো। কিন্তু নিতুর মা শাহেদ এর কথা জানার পর সব গণ্ডগোল হয়ে যায়।

শাহেদের বাবা মায়ের কাছে নালিশসহ নিতুর পড়ালেখা বন্ধের হুমকি দেয়। নিতু সব মেনে নিয়ে সরে আসে। সে ভেবেছিলো শাহেদ তার জন্য অপেক্ষা করবে। সে পড়ালেখা করবে। শাহেদ চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার সময় লাগবে। কিন্তু ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার কিছুদিন পর নিতু জানতে পারে শাহেদ অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। নিতুর দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে যায়। তার সবকিছুর জন্য তার মাকে অপরাধী মনে হয়।

নিতু ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো। সব রাগ তার মায়ের উপর পড়তো। অনেক নিকৃষ্ট ব্যবহার সে তার মায়ের সাথে করতো। নিতুরা ছয় ভাই বোন। নিতু বড়। বড় মেয়ের অনেক দায়িত্ব। এই সব দায়িত্বের জন্যও নিজের উপর রাগ হতো। নিতু তার ভাইবোনকেও সহ্য করতে পারতো না।

নিতুর দুনিয়াটা উল্টো-পাল্টা হয়ে যাচ্ছিলো। ঘটনার প্রায় এক বছর। নিতু নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ওর মায়ের সাথে তার সম্পর্কটা আগের মতোই।

নিতুর মা একদিন বললো, নিতু আমার মাথা ঘুরায়, ভাল্লাগেনা, প্রায় ২ মাসের কাছাকাছি পিরিয়ড মিস। আমার মনে হয় বাবু হবে। নিতু তার মায়ের কথা শুনে চমকে উঠলো। ভাবলো বলে কি এই মহিলা। ওরা ছয় ভাইবোন। বাবার একার খরচ। সব ভাইবোন পড়ালেখা করে। ওর ছোট বোনটার আট বছর। এখন বাবু হলে মানুষ কি বলবে? মানুষ অনেক আজেবাজে কথা বলবে।

নিতু বললো, আম্মু আপনি টেস্ট করান। নিতুর মনে মনে আবার খুশি হতে লাগলো। ওর পিচ্চি ইদানীং খুব ভাল্লাগে। ছোট বাচ্চাদের কাছে গেলে ওর। একটা প্রশান্তি লাগে। নিতুর মা টেস্ট করালো। টেস্ট পজিটিভ। সেদিন তার মা প্রচুর কাঁদল। নিতু এরকম একটা শক্ত মানুষকে কাঁদতে দেখে অবাক হলো। তার বাবা বললো,বাচ্চাটা না রাখতে। নিতুর মা নিজের মনকে শক্ত করতে গিয়েও পারলোনা। নিতুকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল।

নিতু বললো, আম্মু আপনি এই বাবুটা রাখেন। নিতুর বাবা বারবার ফোন দিলো যাতে এভোরশন করায় নেয়। নিতুর মা হাসপাতালে গেলো। নিতুও প্রচুর কাঁদল। কেন কাঁদল সে জানে না। নিতুর খুব কষ্ট হচ্ছিল, সেই ছোট্ট অস্তিত্বটার জন্য যার হয়তো দেহ হয়নি শুধু অস্তিত্ব আছে। নিতুর মা ফিরে আসলো।

নিতু তার মায়ের সামনে যেতে পারলো না। তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। অনেক কষ্টে সে তার মায়ের কাছে গেলো। কান্না আটকাতে গিয়েও হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। তখন তার মা তাকে বললো, পারলাম না এই ছোট অস্তিত্বটাকে হত্যা করতে। আমি এভোরশন করি নি। আমি যদি মরে যাই তুই দেখবি ওকে।

নিতুর কি জানি হলো। যেই নিতু ঠিক করেছিলো কখনো বিয়ে না করে একা কোথাও গিয়ে নিজের মতো থাকবে, যেখানে কোনো দায়িত্ব থাকবেনা, দায়িত্ব পালন না করতে পারা ব্যর্থতা থাকবেনা, সেই নিতু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো মা, আমি ওকে দেখবো। এই একটা অস্তিত্ব যার দেহ এখনো ভালোভাবে হয়নি, এই অস্তিত্ব নিতুকে বুঝিয়ে দিলো জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচা যায়না। সবকিছুর মুখোমুখি হয়ে সমস্যা মোকাবিলা করাই জীবনের স্বার্থকতা।


সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ
৪৯তম আবর্তন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *