একই আলো পৃথিবীর পাড়ে!

সকালের রোদ চোখে এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল তরুর। চোখ কচলে চশমাটা পরে ঘড়ির দিকে তাকালো সে। ঘড়িতে তখন ভোর ৬টা বেজে ২০ মিনিট। তরু সবসময় সকাল ৮টা বা ৯টায় ঘুম থেকে ওঠে। আজ এত সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ সে ধরতে পারছে না । রাতে ঠিকমত ঘুমাতেও পারেনি। কেন এমন হচ্ছে কে জানে? এই সময়ই দরজা ঠেলে তরুর মা রোকয়ো বেগম ঘরে ঢুকলেন।
-কী রে? এখনই উঠে গেছিস যে? ঘুম ভেঙে গেছে?
তরু আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো, হুম।
-ঘুম ভালো না হলে আরেকটু ঘুমিয়ে নে মা। নাহয় চোখের নিচে কালি পড়ে দেখতে বাজে লাগবে।

এতক্ষণে তরু তার অস্থরিতার কারণ ধরতে পারলো। আজ তাকে দেখতে আসার কথা। পাত্রের কোন আত্মীয় না, চাচী-মামী না, সরাসরি ছেলে নিজেই মেয়েকে দেখতে আসবে। তাদের দেখা হবে অবশ্য বাইরে একটা রেস্টুরেন্টে। ঘরোয়া পরিবেশে মেয়ে দেখাদেখি আধুনকি পাত্রের একবোরইে পছন্দ না।

এই পর্যন্ত বেশ কয়েকবার শাড়ি-চুড়ি জড়িয়ে, প্রসাধনী মেখে পাত্রপক্ষের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে তরুকে। কিন্তু এখনো সে কাজটার সাথে অভ্যস্ত হতে পারেনি। কারো দেখতে আসার নাম শুনলইে তরুর অস্থরি লাগে, নিদারুন টেনশনে তার সারাদনি কাটে।

তরু মৃদু হেসে মা-কে উত্তর দিলো, “সারা গায়ে তো এমনিই কালো, মা। নতুন করে আর কোথায় কালি পড়বে বলো তো?”

রোকেয়া বেগম মেয়ের কথা শুনে মলিন মুখ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তরু বছিানা থেকে নেমে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। সে সূর্যের আলো কাচের আয়নায় পড়ে তার মুখটাকওে উজ্জ্বল করে তুলছে। মাথাভর্তি এলোমলেো চুলগুলো নেমে গেছে কোমর র্পযন্ত। তরুর গায়ের রঙ শ্যামলা যাকে খাঁটি বাংলায় কালো বলা হয়, ঠিক তেমনই। চেহারায় তেমন কোন বিশেষত্ব নেই। শুধু ডাগর ডাগর চোখগুলো ছাড়া। সেই চোখগুলোও হাই পাওয়ারি চশমায় ঢাকা পড়ে গেছে বলে তরুর মায়ের দুঃখের অন্ত নেই। তার ধারণা, এত সুন্দর চোখ যে দেখতে পাবে, সে কখনোই তার মেয়েকে অপছন্দ করতে পারবে না। চশমা দিয়ে ঢাকা পড়ে যায় বলেই তরুকে আজও কোন পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়নি।

একটা বশ্বিবদ্যিালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স পাস করেছে সে গতবছর। কন্তিু পাত্র দেখাদেখির পালা শুরু হয়েছে তারও বছর দুই আগে থেকে্ই। কিন্তু আগে তোড়জোড় ছিল না। এখন তরুর বাবা মোকাম্মলে হোসেন তার মায়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য মরয়িা হয়ে উঠেছেন। মোকাম্মলে হোসনে যতই কোন পক্ষকে ধরতে চাইছেন, ততই যেন সবাই পিছলে যাচ্ছে। এই কথা ভেবে তরুর হাসি পেয়ে গেল। পাত্রপক্ষগুলো যেন শিং মাছ আর তার বাবা শিকারী। যতই ধরতে চাইছেন পিছলে যাচ্ছে আর বিষকাঁটাগুলো লাগছে তরুর গায়ে। ব্যথার যন্ত্রণায় বেশ কয়েক দিন ছটফটিয়ে আবারও সেই মাছ ছোঁয়াছুয়ি খেলা। এই খেলার শেষ কোথায়?

ছোটবলোয় তরুর গায়রে রঙ ধবধবে সাদা না হলওে ময়লা ছিল না। কিন্তু দুই বছর বয়সের পর থেকেই তরুর উজ্জ্বল রঙ মলিন হতে শুরু করে আর তা যেন দিন দিন বড়েইে যাচ্ছে। তরুর মা রোকয়ো বেশ কয়কেটি রঙ ফর্সাকারী প্রসাধনী এনে দিলেও তা তেমন কাজ করে নি। কিন্তু তিনি এখনো হাল ছাড়েনি নি। তাদের বাসায় নিয়মিত ৩/৪টি সংবাদপত্র রাখা হয় শুধু রূপচর্যা বিষয়ক লেখাগুলো পড়বেন বলে। তিনি আধুনিক প্রযুক্তি তেমন ব্যবহার করতে জানেন না, তাছাড়া ওগুলো তেমন বিশ্বাসও করেন না। তাই সংবাদপত্রই একমাত্র ভরসা তার। তিনি খুঁটয়ে খুঁটয়ে সব পড়েন। স্পেশাল তথ্যগুলো কাটিং করে রেখে দেন। তরুর মা এবং বাবার জীবন আবর্তিত হয় তরুর বিয়েকে কেন্দ্র করে। তাদের একমাত্র চিন্তার বিষয় হচ্ছে তাদের কন্যার বিবাহ। তরু মাঝে মাঝে ভাবে তার বিয়ে হয়ে গেলে এই মানুষগুলো বাঁচবে কী নিয়ে।

তরুর ভাইবোন নেই। ছোট থেকেইে একা একা বড় হয়েছে সে। ঈদ, পূজার ছুটিতে তরুর, চাচাতো-মামাতো ভাইবোনেরা যখন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসতো, তখন সবার মাঝে থেকে সে বুঝতে পারতো তার চেহারা বদলে যাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনরা তরুর মাকে জিজ্ঞেস করতে করতে জের বার করে দিতেন, কবে তার এই ফর্সা সুন্দর ময়েটো কালো হয়ে গেল। একবার বাচ্চারা সবাই বর-বউ খেলছে, তখন দেখা গেল কেউই তরুকে বউ করতে চাচ্ছে না। ওর এক মামাতো বোন বলেই ফেলল, “মা বলেছে কালো মেয়েদের বিয়ে হয় বোবা-কালার সাথে। আমরা কেউ বোবা-কালা নই, তাই তোর বিয়ে হবে না তরু।”

প্রচণ্ড দুঃখ পেয়ে তরু মায়রে কাছে গিয়ে কেঁদেছিলো খুব। এরপর থেকে তরু আর কোথাও যেতে চাইতো না। নিজেকে একটু একটু করে গুটিয়ে ফেলতে শুরু করেছিলো সেই ছোট থেকেইে। তরুর বন্ধু-বান্ধবও খুব কম। সে কোন আড্ডায় থাকে না। কোনো বিয়েবাড়িতে যায় না। ক্লাস শেষ করে সোজা বাড়ি, এটাই ছিল তার জীবনের গণ্ডি। তরুর ক্যাম্পাসের এক ছেলে সহপাঠী তাকে ডাকতো, কৃষ্ণকলি। সেই ছেলেটাকে তরুর ভালোই লাগতো। ক্লাসে চুপচাপ বসে দূর থেকে তাদের আড্ডা দেখওতো। কখনো ক্লাসে না এলে তরুর মন খারাপ হতো। কিন্তু কখনো বলা হয়নি ওকে তার ভালো লাগার কথা। যে মেয়েটা শৈশবকাল থেকেই হীনমন্যতায় ভুগতে ভুগতে বড় হয়, তার কাছে যেকোন ক্ষুদ্র ইচ্ছেগুলোও থাকে পথের পাশে বেড়ে ওঠা দুর্বাঘাসের মতো।

সেগুলোকে বাড়তে না দিয়ে পিষে ফেলাটাই যেন নিয়ম। তাই তরুও তার সবুজ সবুজ অনুভূতিগুলো মেরে ফেলতে চেয়েছে আজীবন। তাও কিছু ইচ্ছে মুখচোরা হয়ে নিজের অজান্তেই থেকে যায়। তরুর মন ভালো থাকলে সে “কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি গানটা গুনগুন করে গায়। সে এতই আস্তে আস্তে সুর বাঁধে যেন দেয়ালও শুনতে না পায়। যেন কৃষ্ণকলিদের মন ভালো হওয়াটা অন্যায়। কিন্তু আজকাল আর তরুর মন ভালো থাকে না। বাবা-মা তাকে নিয়ে এত চন্তিায় আছে তা ওর ভাবতে ভালো লাগে না। নিজের প্রতি একধরনরে বিতৃষ্ণা ভর করছে ওকে ক্রমশই। পৃথিবীর সবাই ওর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শুধু তার এই কালো কুৎসিত মুখটার জন্যই। কৃষ্ণকলিরা শুধু কবিতা, গল্পেই ভালবাসা পায়। বাস্তবজীবনে তাদের কেউ গ্রহণ করতে চায় না। স্বয়ং রবিঠাকুরই কী বিয়ে করেছিলেন নাকি সেই কৃষ্ণকলিকে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে এসবই ভাবছিলো তরু। ভেবে নিজেই নিজের ভাবনায় লজ্জিত হয়ে গেল। সেও কী ওর বাবা-মা এর মত শুধু বিয়ে কেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করে দিয়েছে?

বিয়েই কী একমাত্র ধ্যানজ্ঞান তপস্যা কোন মেয়ের জীবনে? হঠাৎ তরুর খুব কষ্ট হতে লাগলো। নিজেকে তুচ্ছ, ক্ষুদ্র ভাবতে ভাবতে সে এখন ক্লান্ত। তার বাবা মেয়ের জন্য একটা নতুন শাড়ী কিনে দিয়েছেন কেবল ঐ পাত্রের সামনে পরে যাবে বলে। মোকাম্মেল হোসেনের ধারণা হালকা গোলাপি রঙের শাড়িতে তরুর গায়ের রঙ উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু তরুর ধারণা কোন বইয়ে এমন তথ্য পেয়েছেন মোকাম্মেল সাহেব। শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছলো তরু। একটু সকাল সকালই তৈরি হয়ে নিয়েছে সে। একটু পর পর মায়ের তাগাদা শোনার থেকে রেডি হয়ে বসে থাকা ভালো। এই সময় মোকাম্মেল সাহেব তরুর ঘরে আসলেন।

-কী রে মা, এখনই তৈরি হয়ে গেছিস নাকি? বাহ্ বেশ মানিয়েছে তো রংটায়।
তরু শুধু একটু হাসলো। কছিু বলল না।
মোকাম্মেল সাহেব আবার বললেন, “যেকোন ফর্সা মেয়ে থেকে তোকে কোনো অংশেই কম মনে হচ্ছে না। ছেলে বাপ বাপ করে রাজি হয়ে যাবে দেখিস।”

এই কথা শুনে তরুর মনটা আবারও তিক্ততায় ভরে গেল। তার মানে কনে সবসময় একটা ফর্সা মেয়ের মত হতে হবে? যেখানে তার নিজের বাবা-মা সন্তানের স্বকীয়তা ভালবেসে গ্রহণ করতে পারছে না, তার গায়ের রঙ-কে দুর্বলতা হিসেবে মেনে নিয়েছে, এই সমাজ তাকে আর কিভাবে গ্রহণ করবে? তরুর বাবা-মা যদি সবসময় নিজের মেয়েকে ফর্সা বানানোর চেষ্টা না করতেন, মেয়েকে অন্যের ঘরে দিয়ে দেবার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা না করতেন তাহলে আজ তরু অন্যরকম হতে পারতো। তরু নিজেকে ভালবাসতে পারতো, আর দশটা মেয়ের মত সবার সাথে স্বচ্ছন্দে মিশতে পারতো, গান গাইতে পারতো, কান্না এলে হৃদয় উজাড় করে কাঁদতেও পারতো। সবাই শুধু সমাজরে দোষ দেয় কিন্তু সব সমস্যার সূচনা হয় পরবিার থেকেই। বাবা-মায়ের সন্তানের ভবষ্যিতের প্রতি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন একের পর এক। কিন্তু এতে করে যে ঐ সম্পূর্ণ আলাদা মানুষটা একটু একটু নিজের স্বাতন্ত্র্য হারাতে থাকে তা তারা বুঝতে পারেন না।

তরু পৌঁছে গেল ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টে। পাত্রকে খুঁজে পেতে তার বেগ পেতে হলো না কারণ ছেলেটি নিজেই ওকে খুঁজে নিয়েছে। বেশ লম্বা, সাধারণ চেহারার একটি ছেলে। প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে বছর দুয়েক হলো। প্রথমে দু’জনের কেউই কথা বলতে পারছিলো না। নীরবতা ভাঙলো প্রথমে ছেলেটিই।

-আপনার নামটা সুন্দর। তরু। উচ্চারণ করতে না করতেই মিলিয়ে যায়। আমার নাম জানের নিশ্চয়ই?
তরু মাথা নেড়ে জবাব দেয়,” জ্বী,মাহমুদ।
-আপনি কী অবাক হয়েছেন, কেন আমি আমার সাথে কাউকে নিয়ে আসলাম না?
তরু কিছু বললো না, শুধু তার বড় বড় চোখ দুটি মেলে তাকিয়ে রইলো মাহমুদের দিকে। মাহমুদ নিজেই বলতে শুরু করলো, “আমার সাথে আর কেউ আসেনি কারণ এতজনের খাবারের বিল দেওয়ার মত টাকা আমার নেই। আমি খুব সাধারণ একটা চাকরি করি। তাতে বেতন খুবই কম। এতটাই কম যে কোন বড় হোটেলে দুইজনের বেশী বিল দিতে গেলে আমার মাসের বাকী দিনগুলো হাত কামড়ে পড়ে থাকতে হবে।”

তরুর এই সাধারণ গাট্টাগোট্টা লোকটাকে এক লহমায় পছন্দ হয়ে গেল। কোনরকম কপটতা না রেখে যে নিজের অপারগতা প্রকাশ করতে জানে সে নিঃসন্দেহে ভালো মানুষ। তরু কী কোনদনি পারবে মাহমুদের মত আত্মবশ্বিাসের সাথে নিজের কথা বলতে?
মাহমুদ আবার বলতে শুরু করলো, “আমি বুঝতে পারছি না,আপনার পরবিার কীভাবে আমার সাথে সম্বন্ধ করতে রাজী হলনে? এত চমৎকার একটি মেয়েকে তারা ছেড়ে দিলেন একটা সরকারি কেরানীর সাথে দেখা করবার জন্য?”
তরুর মনে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেছে খুব ধীরে। তার গলার কাছে কী যেন আটকে যাচ্ছে বারবার। এই জীবনে আজ র্পযন্ত কেউ তাকে চমৎকার বলে নি, কিংবা এর কাছাকাছি কোন শব্দ দিয়েও তরুর প্রশংসা করেনি। তরুকে প্রশংসা করার একমাত্র বাক্য হচ্ছে, ‘বাহ তোমাকে তো বেশ ফর্সা দেখাচ্ছে’।
তরু নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “নিজেকে এত তুচ্ছ জ্ঞান করছেন কেন? কেরানীরা কী মানুষ না?”

মাহমুদ এসব কথার কোন ধার না ধেরেইে বলা শুরু করলো,“শোনো তরু, আমি চাইলে আমার মা-কে নিয়ে তোমার বাড়ি যেতে পারতাম, এতে করে কী হতো জানো? তোমাকে সার্কালের পুতুল সেজে আমাদের সামনে বসে থাকতে হতো আর আমওি তোমার সাথে কথা বলার সুযোগ পেতাম না। সমাজের এসব বাজে সিস্টেম আমি ভাঙতে চাইছি। এই যে সরকারি চাকরটিা আমি করছি সেটাও আমার মায়ের অনুরোধে। আমার বাবা নেই। ছোট থেকে মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। আমার মায়ের ধারণা সরকারি চাকরিই জীবনে উন্নতি করার একমাত্র উপায়। কিন্তু আমি অন্য চাকরীও খুঁজছি। পেয়ে গেলে এই চাকরী ছেড়ে দিবো। আমি তখন থেকেই দেখেছি, তুমি খুব আড়ষ্ট হয়ে বসে আছো। এখানে কী তোমার খুব অসুবিধা হচ্ছে?”
তরু তাড়াতাড়ি উত্তর দিলো, “না, না,আমি ঠিক আছি। আপনি বলুন না, আমি শুনছি।”
মাহমুদ একটু হেসে উত্তর দিলো, “তুমি কী জানো তোমার কোন ছবি আমাকে পাঠানো হয়েছে?”

ফোন বের করে তরুর একটা ছবি তাকে দেখালো মাহমুদ। ছবিতে তরু-কে খুব ফর্সা মনে হচ্ছে। তরুর মুখ অপমানে লাল হয়ে গেল,তার চোখ ফেটে জল আসছে। আর কতবার তাকে এভাবে অপমানিত হতে হবে?

তরুর এই অবস্থা দেখে মাহমুদ একটুও বিচলিত না হয়ে বললো, ”তরু আমার তোমাকে পছন্দ হয়েছে। ছবি দেখে ভালো লেগেছিলো বলেই এসেছি কিন্তু বাস্তবে দেখতে আরও মায়াবী মনে হয়েছে। ছবিতে তোমার এই দুঃখী দুঃখী মায়াবী ভাবটা নেই। কিন্তু সামনাসামনি আছে। তরু আমি জানি, কেন তুমি জড়সড় হয়ে আছো। এই জায়গায় আশেপাশের সবাই বেশ ফ্যাশনেবল, চকচক করছে সবাই। সেখানে তোমার নিজেকে একেবারেই বেমানান লাগছে। তুমি ভাবছো, সবাই তোমাকে আড়চোখে দেখছে আর হাসাহাসি করছে। ঠিক না?”

তরু কোনো উত্তর না দিয়ে চোখের পানি মুছলো। ক্রমইে এই অসাধারণ মানুষটার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে সে। এতটা গুরুত্ব দিয়ে কেউ কখনো তার সাথে কথা বলে নি। কেউ কখনো তাকে বোঝার চেষ্টাও করেনি। এই প্রথম কারোর চোখে সে সুন্দর হতে পারলো।
মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলা শুরু করলো, “কিছুক্ষণ আগে তুমিই আমাকে বলছিলে নিজেকে তুচ্ছজ্ঞান না করতে আর এখন তুমি কী করছো বলো তো? কী নিয়ে এত দুঃখ তোমার? গায়ের রঙ নিয়ে?”
এ সময় তরুর একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের হাতের পাশে রাখলো সে। তরু ঘটনার আকস্মিতায় এতটাই বিহ্বল যে, বুঝতেই পারছে না কী হচ্ছে।

মাহমুদ বলতে শুরু করলো, দেখো, তাকিয়ে দেখো,আমি তোমার চেয়েও কালো। কই আমার তো দুঃখ হচ্ছে না। এমনকি কোনদিন আমার মনেও হয় নি কেন আমি কালো হলাম আর আমার বোন ফর্সা হয়ে জন্মালো। তরু তুমি হয়ত বেশ স্বচ্ছল পরবিারে বেড়ে উঠেছো তাই গায়ের রঙ নিয়ে মাথা ঘামাবার মত অজস্র সময় তোমাদের হাতে ছিল। কিন্তু আমাকে বড় হতে হয়েছে দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করতে করতে। আমি ছোটবেলায় জানতাম না, দুপুরে ভাত খেলে রাতে ভাত খেতে পারবো কিনা। সবাই পড়াশোনা করতো একটা ভালো রেজাল্টের আশায় আর আমি করতাম যেন স্কলারশিপ পেতে পারি। স্কলারশিপের টাকায় যেন পড়ালেখাটা চালিয়ে নিতে পারি, থামতে না হয়।

আমি বুঝতে পেরেছি, কেন তোমার বাবা এই সম্বন্ধ করতে রাজী হয়েছেন। তারাও তোমার মত তোমার রঙ নিয়ে খুশি নন। পৃথিবীর একটাই রং আর সেটা হলো ক্ষুধা। বাকী যেসব ছাইপাশ রয়েছে তা তৈরি করে সমাজ, তোমার আমার মত অনেকের বাবা-মা। এই সমাজের রঙ আমি বদলাতে পারবো না কিন্তু নিজেকে যেন এই নোংরা সিস্টেমের বলি হতে না হয় সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। তুমিও নিজেকে বলি করো না। কখনো নিজেকে অসুন্দর ভেবো না।”

তরু মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই বিস্ময়কর মানুষটার কথা শুনে যাচ্ছিল। তার কাছে আশেপাশের সবকিছু এক মুহূর্তের জন্য বিলীন হয়ে গিয়েছিল। তারা যেন প্রস্তর যুগের ধ্বংসাবশেষ এর মাঝে বসে থাকা এক জোড়া জীবন্ত প্রাণ।

সন্ধ্যা তারার মত ঝলমল করতে করতে তরু বাড়ি চলে এলো। আজ তরুর দিনটা অন্যসব দিন থেকে আলাদা। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় মার্ক করে রাখলো সে। ঘরে ফিরে কারো সাথে কথা না বলে দরজা বন্ধ করে দিলো। আজকের এই সময়টা শুধু সে নিজের জন্য রাখবে। দরজা বন্ধ করে এতদিনের লুকানো সব কান্না একসাথে বের হয়ে আসলো। এতগুলো বছরের অবহেলা, এত মানুষের অবজ্ঞা, টিপ্পনী, নিজেকে সবকছিু থেকে বঞ্চিত রাখা আর কোন এক অচেনা মানুষের প্রতি জন্মানো আবেগ সবই যেন চোখের পানি হয়ে বের হচ্ছে হৃদয়ের কোণ থেকে। তরুর মনে ভাসছে প্রথমবার ওকে যখন দেখতে এসেছিল সেইদিনের কথা। ছেলের মা ওকে দেখে বলেছিলো, ”তা মা, গায়ের রং এত পোড়ালে কী করে? বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে খুব রোদে ঘোরাঘুরি করো বুঝি?”

তরুর মনে পড়ছে, তার বাবা ওর এক জন্মদিনে একটা দামী পুতুল উপহার দিয়েছিল। তরু রাগ করে সেই পুতুলের গায়ে কালো রং করে দিয়েছিল।
তরুর কান্নার আওয়াজ এখন ওর বাবা-মা শুনতে পাচ্ছে। তারা ভয়ে আতংকে অস্থির হয়ে বারবার দরজায় আঘাত করছে। তরুর মা কান্না জুড়ে দিয়ে বলছেন, ”কী হয়েছে মা বল? আর কখনো তোকে কারো সামনে যেতে হবে না মা। ঐ ছেলে কী বলেছে তোকে মা?”
তরুর বাবা, “আরে না বললে বুঝবো কী করে? আমি এখনই ঐ ছেলের বাড়িতে ফোন করছি। ঐ কেরানীকে আমি পুলিশে দেবো।”
এই সময় তরু চোখ মুছে দরজা খুলে বললো, ”আমি ঠিক আছি মা। তোমাদের কাউকে কিছু বলতে হবে না।”

তরুর মা ইনিয়ে বিনিয়ে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে ওখানে কী হলো কিন্তু তরু কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেয়নি। রাতে তরু অপেক্ষা করছিলো মাহমুদের ফোনকলের। কিন্তু কোনো ফোন আসেনি। তরু মরে গেলেও ওকে ফোন করতে পারবে না তাই অপক্ষো ছাড়া ওর কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না। তরু সারারাত ঘুমাতে পারলো না। চোখ বন্ধ করতেই মাহমুদের মুখটা ওর সামনে ভেসে উঠছিল। এই অনুভূতি ওর ছাব্বিশ বছরের জীবনে এই প্রথম। তরু তার শাড়িটা ভাঁজ করে যত্ন করে তুলে রাখলো। আজকে যা যা ব্যবহার করেছে-চুলের ক্লিপ, স্যান্ডেল থেকে শুরু করে কপালের টিপটা পর্যন্ত আলাদা বক্সে রেখে দিলো সে।

জানালা খুলে তার সামনে দাঁড়ালো তরু। আকাশে তখন পূণিমার ঝকঝকে চাঁদ। এতদনি সব সুন্দর থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছে সে। কিন্তু আর না। যে যাই মনে করুক, এই পৃথিবীর কাছে সবার যেমন দাবী, তারও ঠিক ততোটাই। নিজেকে আর কখনো এতটুকু ছোট হতে দেবে না সে।

সকাল হয়ে গেল। নাশতার টেবিলে তরু খুব হেসে হেসে সবার সাথে কথা বললো। তরু বললো, ”বাবা আমি চাকররি পড়াশোনা শুরু করবো। তোমাদের ঘাড়ে বসে আর কতদনি বলো?”
এই কথা শুনে তরুর বাবা-মা অবাক হয়ে গেল। ওর বাবা বললনে, ”ঠিক আছে মা, কর। তুই যা ভালো মনে করিস।” তরুর বাবা-মা মেয়েকে এত প্রাণবন্ত আগে তেমন দেখেনি। তারা বুঝতে পারলো, গতকালরে ঘটনার জন্যই তার মেয়ের এত পরিবর্তন। নিশ্চয়ই ছেলেরে পছন্দ হয়েছে তরুকে। মোকাম্মেল হোসেন নিশ্চিন্ত মনে বাজার করতে গেলেন। সারাদিন গেল তরুর কাছে কোনো ফোন এল না। হয়্ত অফিসে আছে ভেবে তরু অন্য কাজে মন দিতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারছিল না। তরু নিজেই কী দেবে? না, না তাহলে মাহমুদ ওকে হ্যাংলা মেয়ে ভাববে। নাকি ফোন করেই দেখবে, যা ভাবার ভাবুক। এইসব দোটানায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। কিন্তু ফোন আর এলো না।

এদিকে ফোনের অপেক্ষা করছেন মোকাম্মেল সাহেবও। ছেলেরে পছন্দ হলে তাদের তো পারিবারিকভাবে জানাতে হবে নাকি, এভাবে চুপ মেরে বসে থাকলে তো কিছুই আগাবে না। মোকাম্মেল সাহেব ঘটককে ফোন দিলেন রাতে। ঘটক বললেন, তিনি পরে জানাবেন। কিন্তু ঘটকও আর ফোন দিলেন না।
বাবা-মায়ের দুশ্চন্তিা আর ওর অস্থরিতা সবকিছুর জন্য তরু নিজেই মাহমুদকে ফোন দিলো। রিং হয়ে কেটে গেল কেউ রিসিভ করলো না। বাইরে আকাশে গাঢ় মেষ জমেছে । তরু জানালা বন্ধ করতে গেল কিন্তু করলো না। বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ছাঁটে তার গায়ের ওড়না ভিজে যাচ্ছে। ভিজে যাচ্ছে ওর সেলফে রাখা বইখাতাও। তরু ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে জানালার সামনে। যেন এই জানালা দিয়েই কোন এক কাঙ্খিত খবর আসবে। এলো না, কেউ এলো না কোন সুখবর নিয়ে।

ফোন এলো রাতে। ঘটক জানালো পাত্র-র মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে কিন্তু ছেলের মুখে পাত্রীর বর্ণনা শুনে ছেলের মা না করে দিয়েছেন। এ নিয়ে ঐ বাসায় মহা গোলযোগ বেঁধেছে। ছেলে বিয়ে করবেই কিন্তু মা কিছুতেই কালো মেয়েকে ঘরে তুলবেন না। ছেলের সাথে রাগ করে মায়ের খাওয়া দাওয়া বন্ধ। অগত্যা ছেলেকে মায়ের কাছে হার মানতেই হলো। ঘটক ফোন করতেই নাকি ছেলের মা ঘটককে রাজ্যের গালিগালাজ করেছেন কেন তিনি জেনেশুনে এমন মেয়ের সাথে তার হীরের টুকরো ছেলের বিয়ের প্রস্তাব দিলো।

একটানা দুইদনি খুব বৃষ্টি হলো ঢাকা শহরে, সাথে বজ্রপাতও। বৃষ্টির পানি জমে রাস্তাঘাট ভেসে গেলো। দু’দিন পর আজ আবারও রোদের দেখা মিলেছে। তরু সেদিনের পর জানালাটা আর একবারের জন্যও লাগায় নি। খুব স্বাভাবকিভাবে ঘরের কাজকর্ম করেছে, বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেছে। কিন্তু মা খুব কেঁদেছেন আর বাবা-ও গম্ভীর। তরু সংবাদপত্র গোছানোর সময় হঠাৎ একটা লেখায় চোখ আটকে গলে। একটা কলাম, নাম “ঘৃণ্য সমাজব্যবস্থা এবং আমরা”লেখক মাহমুদ নূর। সবটা কলাম পড়লো তরু। ওকে যা বলেছিলো সেদিন,তারই সারমর্ম লেখা কলামটায়। এই সমাজরে ঘৃণ্য সিস্টেম থেকে বের হওয়ার উদাত্ত আহ্বান করেছে লেখক। লেখাটা পড়ে খুব হাসলো তরু। হাসির শব্দ শুনে তার মা ঘর থেকে বের হয়ে ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, ”কী হয়েছে? কী হয়েছে?”কোন উত্তর না দিয়ে মায়ের হাতে পেপারটা দিয়ে ঘরে চলে গেল তরু হাসতে হাসতেই। ও বুঝতে পারছে না কেন এই হাসি। মাহমুদের হিপোক্রেসির জন্য হাসি পাচ্ছে নাকি মাহমুদের মত এত আত্মবশ্বিাসী ছেলেকেও মাঝে মাঝে সমাজব্যবস্থার ঘৃণ্য সিস্টেমের বলি হতে হয়, তাই?

অনেকেই চায় সমাজটাকে বদলে দিতে কিন্তু পারে না। তাদের সময়, তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সেই কাজে তাদের পাশে থাকে না। মাহমুদ তাদের দলেরই একজন। হঠাৎ মাহমুদের প্রতি করুণা হয় তরুর। মাহমুদ ওকে নিষেধ করেছিল এই সমাজের ঘৃণ্য সিস্টেমের বলি হতে কিন্তু বলি হলো মাহমুদ নিজেই। হয়ত মাহমুদ বেঁচে গেলো। তবে তরু আর বলি হবে না। অন্য কারো আশায় নিজেকে গুটিয়ে রেখে দিন পার করবে না সে। এই দারুণ সুন্দর পৃথিবীতে হয়ত একবারই জন্মানোর সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ অবহেলা আর অপমানে নষ্ট করবে না সে।

জানালা দিয়ে বৃষ্টি শেষে কাচা রোদ্দুর পড়ছে। জলে ভেসে যাওয়া রাস্তাঘাট শুকিয়ে গেছে, কোথাও আর জলের এতটুকু চিহ্ন নেই। তরু ধীর পায়ে জানালার কাছে আসলো। এই জানালা থেকেই তরুর বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। একবার নিজের ভেতরকার জানালা খুলে দিয়েছে সে, রোদ-ঝড়-তুফান যাই হয়ে যাক না কেন, তরু আর সেটা বন্ধ করবে না। বৃষ্টি শেষের কাচা রোদ্দুর ঝরে পড়ছে তরুর সবুজ গালে। তরু হাত জানালার গরাদে রেখে রোদ্দুর ছুঁতে চাইছে। আপনমনে আবৃত্তি করছে,“আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদনি-কতদনি আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো-একই নক্ষত্রের নীচে তবু-একই আলো পৃথবিীর পাড়ে।”
ঠিক তখনই জানালা দিয়ে মাহমুদকে আসতে দেখলো তাদের বাড়ির দিকে।
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *