কুকুরের প্রতি কেন এই নির্মমতা!

মানবজাতির সৃষ্টিলগ্ন, সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে কিছু সম্পর্ক মানুষকে সাহায্য করেছে বিবর্তনে; সাহায্য করেছে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে। মানুষের চলার পথে এই সম্পর্কের অন্যতম সঙ্গী হল কুকুর। কুকুরকে পোষ মানানোর প্রথা আনুমানিক প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে শুরু হলেও মাইটোকন্ড্রিয়াল ডি এন এ (mDNA) পরীক্ষায় জানা যায় এরা স্বজাতি নেকড়ে থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল প্রায় এক লক্ষ বছর আগেই। কুকুরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, প্রভুভক্তির জন্যই মানুষ ও কুকুরের এই বন্ধুত্ব আজ ভালোবাসার সম্পর্কে রূপ নিয়েছে। যার ফলস্বরূপ আমরা দেখি সর্বস্তরের মানুষের সাথে কুকুরের আত্মিক যোগাযোগ। কিন্তু সম্প্রতি দেশের রাজধানীতে কুকুরের উৎপাত বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন একদল মানুষ, যার জের ধরে প্রভুভক্ত এই প্রাণিকে শহরের অলিগলি থেকে অপসারণ করা হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে অভিযোগের পর, গতবছরের ৩০ অগাস্ট থেকে শুরু হয়েছে এই তথাকথিত অভিযান। বলা হয়েছে, ঘনবসতি এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হবে এদের, কিন্তু কোথায় তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। এদিকে, স্থানান্তরিত বা অপসারণ এর নামে চলছে চরম অমানবিকতা। কোন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৩০ হাজার কুকুর অপসারণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অজ্ঞান করে ট্রাকে উঠিয়ে সরাসরি এসব কুকুরদের কি ফেলা হচ্ছে ভাগারে! অথচ ২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইন অনুযায়ী বেওয়ারিশ কুকুর হত্যা বা স্থানান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগকারীদের মতে, এলাকায় কুকুর অনেক বেড়ে যাওয়ায় কুকুরের উৎপাত, কামড় ও যন্ত্রণায় তারা অতিষ্ঠ। বাচ্চারা স্কুলে যেতে ভয় পায়। অনেক সময় কুকুররা নাকি রিক্সায়ও ঝাপ দেয়!

এছাড়াও রাতে বা ফজরের নামাযের সময় এরা দলবেঁধে অতর্কিতে হামলা করে মুসল্লিদের উপর। তাই এসবের হাত থেকে স্বস্তি পেতে তাদের এই অভিযোগ যার ফলস্বরূপ এই কুকুর হত্যা! কিন্ত, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বাধা পড়েছে এই ধ্বংসলীলায়। প্রতিবাদ জানিয়েছে PAW এর মত প্রানি কল্যাণ সংস্থাগুলো। আইন অনুযায়ী, কুকুরের বন্ধ্যাত্বকরণের মাধ্যমে এর সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, হত্যা করে নয়। কিন্তু এই কথাকে প্রায় আমলেই নেয়া হচ্ছে না। উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মাঝে মাঝে হলেও, দক্ষিণে বন্ধ্যাত্বকরণের কোন কার্যক্রমই নেয়া হয়নি প্রায় দুবছরের মত। আমাদের সৌভাগ্য যে জয়া আহসানের মত প্রথম সারির অভিনেত্রীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন মানুষদের আমরা পাশে পেয়েছি।

অত্যন্ত কষ্টের বিষয় যে, এইসব অভিযোগকারীরা বুঝতেই পারছেন না কুকুর অপসারণ ভালো কিছু তো বয়ে আনবেই না, উল্টো সমাজ চরম ক্ষতির মধ্যে পড়বে। বাস্তুতন্ত্রে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মহামারির মত বেড়ে যাবে ইঁদুর, ছুঁচো। তখন নিশ্চিত ভাবেই তারা হামলা করবে মানুষের বাসাবাড়িতে, সেই সময় কুকুরগুলোর প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষনকারীরাও কিন্তু বাদ যাবেন না! ইঁদুর মারার বিষই তখন একমাত্র সমাধান! যেখানে সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার কথা ছিল, সেখানে ধ্বংসলীলায় হত্যায় মেতেছেন কর্তৃপক্ষ। গুটি কয়েক অদূরদর্শী মানুষের জন্য নির্মমতার স্বীকার হচ্ছে হাজার হাজার অসহায় প্রাণি। অথচ ওনারা ভুলেই গেছেন যে, এই শহর মানুষের একার না, তাদের সমান অধিকার নিয়েই এই শহরে বাস করে কুকুর, বিড়াল, কাক সবাই।

বৈজ্ঞানিক ও স্বেচ্ছাচারী এই সিদ্ধান্তে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ও ডিএসসি ছাড়া আর কেউই সন্তুষ্ট নন। যদিও সাধারণ মানুষের কোন তোয়াক্কাই করছেন না তারা। এই শহরে কুকুরগুলো শুধু বেঁচে থাকা ছাড়া আর কিছুই চায়নি। পেটের ক্ষুধাও এরা মিটিয়েছে এর ওর বাড়ির সামনেকার অথবা ডাস্টবিনের ময়লা খেয়ে। কি আশ্চর্য, সামান্য একটা জীবের রাস্তাঘাটে স্বাধীন চলাফেরাও আমরা মেনে নিতে পারছি না! কিন্তু, কেনো? এটা কি শুধুই মানুষ হিসেবে নিজের ক্ষমতার বহি:প্রকাশ? একটি প্রাণির উপর নির্মম অত্যাচার কারণ তার প্রতিবাদের ক্ষমতা নেই শুধু কুই কুই করে সাহায্য প্রাথর্না ছাড়া? এতো কাছে থেকেও আমরা বুঝতে পারছিনা অথচ শত মাইল দূরে থেকে ভারতীয় প্রাণি অধিকার কর্মী মানেকা গান্ধী তার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ‘ঢাকার অসংখ্য সচেতন নাগরিকের বার্তায় আমরা শঙ্কিত।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অনেক কুকুরকে মেরে ফেলা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পশুর জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করুন। যেখানে শুধুমাত্র র‍্যাবিস এর টিকা এবং লাইগেশন এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, সেখানে কেনো গণহারে হত্যা করা হচ্ছে সেই উত্তর মনে হয় কারো কাছেই নেই! তবে আশার কথা এই যে, অভয়ারণ্য’ ও ‘পিপলস ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ নামের দুটি প্রাণিকল্যাণ সংগঠন এবং অভিনেত্রী জয়া আহসানের ওই রিটের ইতিবাচক জবাব এসেছে। বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের আইন অনুযায়ী যা করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বে আইনি, সুতরাং অবিলম্বে এটি বন্ধ করা হোক। এছাড়াও সংস্থাগুলো দেয়ালে আকার মত বিভিন্ন কাজ করেছে। ধানমন্ডির ১০ নম্বরে যে রঙিন দেয়ালচিত্র করা হয়েছে তা অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে কুকুরের বাস্তব জীবনচিত্র।

সবাই সম্মিলিতভাবে কিছু কুকুরের বিনিময়ে যে বাকিদের বাঁচানো গিয়েছে তাই বা কম কিসে। যদিও এ ব্যাবস্থা সাময়িক। কে জানে এরপর হয়তো আর কেউ অভিযোগ করতেও আসবে না, নিজ হাতে লাঠি অথবা ভাতের গরম মাড় তুলে নেবেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *