চেরির রাজ্যে অন্য ভাবনা

সম্প্রতি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁর তিনবাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। এই সফরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামের খুব একটা জানা নেই। কারণ আমাদের দেশীয় মিডিয়া কেন জানি একেবারে চুপচাপ। দু/একটা কলামে খানিকটা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে এই সফর নিয়ে। এরই একটা নিউ এজ পত্রিকায় লিখেছেন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক এবং ভু-রাজনীতি বিশ্লেষকএমকে ভদ্রকুমার। ভদ্র কুমারের ইংরেজিতে লেখার  একই সাথে আক্ষরিক এবং ভাবানুবাদকরেছেন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তানজীন আহমেদ
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের গেল বুধবারের বাংলাদেশ সফর অবাক করার মতো ব্যাপার। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই কোন ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। এটা প্রমাণিত যে , বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখলেও দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোন সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। দুটো কারণকে দায়ী করা যায় এ জন্যে – প্রথমত , বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সন্দেহ , অবিশ্বাস। কারণ , পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ‘জঠর’ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম।  দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বরাবরই সন্দিহান। দু-দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নানা ইস্যুতে বিবাদ এ সন্দেহে আরো জ্বালানী জুগিয়েছে। মনোহর পারিকরের এই সফর কি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকা সন্দেহের মেঘ দূর করতে পারবে ? এই প্রশ্নের কোন সহজ-সরল উত্তর নেই।

এটা স্পষ্ট যে, চীন থেকে বাংলাদেশের দু’টো সাবমেরিন ক্রয়ের ঘটনাায় ভারতের নীতিনির্ধারকরা নড়েচড়ে বসেছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী , পারিকর দু-দেশের মধ্যে একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত করতে চাচ্ছে এবং কিছু অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পালে হাওয়া লাগাতে চাচ্ছে। ‘ চীন কর্তৃক বাংলাদেশকে সাবমেরিন প্রদান ’ ভারতের নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞদের চোখে চীন কর্তৃক ভারতকে রণকৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলার চক্রান্ত। তিন বাহিনীর উপ-প্রধানকে নিয়ে পারিকরের বাংলাদেশ সফর সে আলোকে দেখতে হবে।
অন্ততপক্ষে ভারতের বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশী গণমাধ্যম এমনটিই বলছে। নিচের বিষয়গুলো আমলে নিলে ভারতের নীতিনির্ধারকদের এই যুক্তি খুবই উদ্ভট মনে হবে। বাংলাদেশ এখানে ক্রেতা , গ্রহীতা নয়। একইভাবে চীন এখানে বিক্রেতা , দাতা নয়। এটা নিঃসন্দেহ যে , ৪০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মোটা অঙ্কের অর্থ এবং চীনের জন্য এটি লোভনীয় চুক্তি। বাংলাদেশ যদি অস্ত্র ক্রয়ের জন্য লাখ লাখ মার্কিন ডলার খরচ করে তাহলে এটা স্পষ্ট যে , এ সিদ্ধান্ত ইচ্ছাকৃত , সুবিবেচনাপ্রসূত ও ভবিষ্যৎমুখী। অবশ্যই এ সিদ্ধান্ত সে দেশের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কর্তৃক অনুমোদনপ্রাপ্ত। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এই প্রথম সাবমেরিনের অধিকারী হল। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, ২০১৩ সালে যখন বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে এ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল ঠিক তখন রাশিয়া বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিতে চেয়েছিল সে দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ প্রথমটিই বেছে নেয়।
যে বিষয়ে আলোচনা করা সবচেয়ে জরুরি তা হচ্ছে , কেন বাংলাদেশের, যার তিন দিক বন্ধুরাষ্ট্র ভারত দ্বারা ভৌগলিকভাবে বেষ্টিত, সাবমেরিন কেনার দরকার হল ? ( সাবমেরিন আক্রমণাত্মাক নৌযান যা টরপেডো ও মাইন দ্বারা সজ্জিত। শত্রু জাহাজ ও সাবমেরিন আক্রমণে সক্ষম। ) সাবমেরিন ক্রয়ের পেছনে বাংলাদেশের অবশ্যই কিছু যুক্তি আছে। মায়ানমার , থাইল্যান্ড বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়। তাহলে হুমকি কে ? বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়ের পেছনের কারণ মনোহর পারিকরের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। খতিয়ে দেখা এজন্য প্রয়োজন যে , নরেন্দ্র মোদী যখন দাবী করছে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক চমৎকার , তখন বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্রয় করল।
ভারতের ত্রুটিযুক্ত প্রতিবেশি-নীতি
প্রতিবেশীরা ভারতকে কীভাবে দেখে , কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে ভারত সে বিষয়কে উপেক্ষা করে। বাংলাদেশ মনে করে, যদি কখনো ভারতের আগ্রাসণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন পড়ে তাহলে সাবমেরিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে , বঙ্গোপসাগরে নৌ-চলাচলের অধিকারের উপর বাংলাদেশ জোর দেবে এবং নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে তাঁরা সার্বভৌম ক্ষমতা হিসেবে দেখবে। অনুমেয় যে , বাংলাদেশ সাবমেরিন দিয়ে কী করবে, এমন প্রশ্ন করে চীন দেশটিকে বিরক্ত করতে চায়নি, যেমনটি ভারত করেনি শ্রীলঙ্কাকে ; যখন হাম্বানটোটা বন্দর উন্নয়নের জন্য শ্রীলঙ্কা ভারতের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। তাঁদের নিকটবর্তী দেশে অস্ত্র রপ্তানীকে চীন বৈদেশিক বাণিজ্য বলে মনে করে। এবং ৪০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা সূচনা হিসেবে চমৎকার। বাংলাদেশের অস্ত্র বাজারে চীন তাঁর একক আধিপত্য বজায় রাখল বরাবরের মতো। চীনের অজানা নয় যে , অস্ত্র ব্যবসায় রাশিয়া এ অঞ্চলে তাঁদের প্রধান প্রতিপক্ষ। একারণেই সামরিক সরাঞ্জমের মানের সাথে তাঁরা কখনোই আপোষ করবে না। চীন থেকে ক্রয়কৃত সামরিক-যানের কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশ সন্তুষ্ট থাকলে চীনের নতুন বাজার ধরতে সুবিধা হবে।
উদাহরণসরূপ , ইরান বাংলাদেশের পথ অনুসরণ করতে পারে। ইতোমধ্যেই ইরান তাঁদের নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য চীনের সাহায্য চেয়েছে। ‘Washington Institute of Near East Policy’ নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি বিশ্লেষণ করে দেখেছে , চীনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক যান ইরানের নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য সহায়ক। যার মধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাবমেরিনও আছে যা উপকূল ও গভীর সমূদ্রে অত্যন্ত কার্যকারিতার সাথে ব্যবহার করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের প্রাযুক্তিক দিক দিয়ে সর্বাধূনিক কিছু যুদ্ধজাহাজের তালিকা দিয়েছে যা ইরান ক্রয় করতে আগ্রহী। । যার মধ্যে আছে, টাইপ ০৫২ ডেস্ট্রয়ার , টাইপ ০৫৭ ফ্রিগেট , দ্য পি-১৮ ফ্রিগেট , মিসাইল সজ্জিত সেমি- স্টিলথ কভার্ট ইত্যাদি। উর্পযুক্ত বিষয়গুলো আমাদের কী বলে ? প্রথমত , ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশে অস্ত্র রপ্তানী চীন গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। ( চীনা সাবমেরিন পেতে থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে। ) দ্বিতীয়ত , ভারতের প্রতিবেশী দেশে চীনের অস্ত্র রপ্তানী দেখে ভারতের মাথা খারাপ করার কোন কারণ নেই। তৃতীয়ত , চীনের অস্ত্র রপ্তানী বাণিজ্যকেন্দ্রিক , রণকৌশলকেন্দ্রিক নয়। চীন বাণিজ্যের সাথে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে ফেলছে না।
সর্বশেষ , আমাদের দিক থেকে এটা ভাবা অযৌক্তিক যে , বাংলাদেশের নিকট চীনের দু’টো সাবমেরিন বিক্রয় ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার কৌশল । আমাদের যে প্রশ্নটা করতে হবে তা হল , কেন বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ক্রয় করে অস্ত্র সম্ভার গড়ে তোলাকে অপরিহার্য মনে করছে ? বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর উন্নয়নে চলমান আধুনিকায়ন কর্মসূচি তখনই চলছে যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্রমশ অবনতি পরিলক্ষিত। আমরা স্বীকার করি বা না করি , ভারতের পেশীশক্তি চালিত কূটনীতি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। যখন মোদি পাকিস্তানকে এই বলে হুমকি দেয় যে , রাভি-সিন্ধু নদের এক ফোঁটা পানিও পাকিস্থান পাবে না তখন আমরা ভারতীয়রা ভাবি , ‘ পেশীশক্তি প্রদর্শন কূটনীতি ’ আসন্ন পাঞ্জাব নির্বাচন সামনে ভালো রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু তাঁর কথা অন্য ভাবেও অনুরণিত হয়।
দৃঢ় সত্য হচ্ছে তাঁর কথাগুলো একজন পাষাণহৃদয় মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয়যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাষাণহৃদয় হয়ে এ ধরণের কথা বলতে পারেন তখন এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস করার কারণ থাকে না। নরেন্দ্র মোদীর এ বক্তব্য হয়তো বাংলাদেশকে ভাবতে বাধ্য করবে। কারণ নদীর পানি-বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সমস্যা রয়েই গেছে। আর নদীর পানি-বণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশ এমনিতে ত্যক্ত-বিরক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *