আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > আলোড়ন > সিরিয়া সংকটের পেছনে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব না অন্য কিছু?

সিরিয়া সংকটের পেছনে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব না অন্য কিছু?


আশরাফ রহমান:


বাশার আসাদ একজন সেক্যুলার। তিনি শিয়া হলেও তার স্ত্রী একজন সুন্নি। তার মন্ত্রী পরিষদ সদস্য ও সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই সুন্নি। আমি মনে করি, সিরিয়ায় যে যুদ্ধ চলছে তা শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নয়। যদি বাশার আসাদ কট্টর শিয়া হতেন তাহলে তো প্রথমেই তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার কথা। মন্ত্রিপরিষদ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে সুন্নিদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথা। কিন্তু তা তিনি করেননি। বাশার আসাদের অপরাধ তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীদের নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছেন, ইসরাইল বিরোধী হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিচ্ছেন, তিনি মার্কিনবিরোধী শক্তি ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতি গ্রহণ করেছেন। বাশার যদি এদের সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ইসরাইল-আমেরিকার সঙ্গে আরব রাজাদের মতো দাসত্বের নীতি গ্রহণ করতেন তাহলে কোনোদিন তার দেশে হামলা হতো না। ইসরাইল বহুবার সিরিয় সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে তাকে স্বীকৃতি দেয়ার, বিনিময়ে গোলান মালভূমি ফিরিয়ে দেয়ার কথাও বলেছে। কিন্তু বাশার আসাদ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে গাদ্দারি করেননি।
২.
পক্ষান্তরে সৌদিসহ অন্যান্য আরবদেশ ও তুরস্ককে দেখুন। তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তুরস্ক তার দেশের ভেতর দিয়ে দায়েশকে সিরিয়ার প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। আর সৌদি আরব সরাসরি দায়েশসহ অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতা করছে। তারা এসব করছে মার্কিন সরকারের নির্দেশে। এখানে শিয়া-সুন্নি ইস্যু মুখ্য নয়। যদি একে শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ বলেন তাহলে আমেরিকা, বৃটেন ও ইসরাইলকে সুন্নিদের নেতা বলতে হবে। কারণ বাশার বিরোধী আগ্রাসন চলছে এদের নেতৃত্বে।
৩.
সিরিয়ার যুদ্ধ যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের কারণে নয় তার কিছু প্রমাণ দিচ্ছি। প্রথম কথা হচ্ছে সৌদি আরব সুন্নি রাষ্ট্র নয়, তারা ওহাবী। অতীতে ইরানের রেজা শাহ পাহলভীর (যিনি শিয়া ছিলেন) সঙ্গে সৌদি আরবের গলায় গলায় ভাব ছিল। কারণ রেজাশাহ ছিলেন আমেরিকা, ব্রিটেন-ইসরাইলের মিত্র। রেজা শাহ যখন সৌদি সফর করেন তখন সেখানকার মুফতিরা রেজাশাহ হাতে চুমু খেয়ে নিজেদেরকে ধন্য মনে করেছিল। আর বর্তমান সৌদি বাদশাহ সালমান (তখন যুবরাজ ছিলেন) নেচে-গেয়ে রেজাশাহকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। একজন শিয়াকে ঘৃণা না করে এরকম তাজিম করার কারণ কী? তখন কোথায় ছিল সুন্নি আকিদার চেতনা?
৪.
এবার লক্ষ্য করুন ইয়েমেনের দিকে। সেখানকার স্বৈরশাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহ ছিলেন একজন যায়দী শিয়া। তিনিও আমেরিকা-ইসরাইলের সেবাদাস ছিলেন। তাকে রক্ষার জন্য সৌদি আরব চেষ্টার ত্রুটি করেনি। এখন সেই আবদুল্লাহ সালেহ’র উত্তরসূরিকে রক্ষার জন্য ইয়েমেনে আগ্রাসন চালাচ্ছে সৌদি আরব।
রেজাশাহ ও আলী আবদুল্লাহ সালেহ শুধু মার্কিন ও ইসরাইলপন্থি হওয়ার কারণে সৌদি সরকার তাদের মিত্র ছিল। ঠিক একইভাবে বাশার আসাদ মার্কিন ও ইসরাইলবিরোধী হওয়ার কারণে সৌদি আরব তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
৫.
আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন। ইরাকে কিন্তু কোনো স্বৈরশাসক ছিল না। সেখানেও দায়েশ সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে সৌদি আরব। ইরাকের বহু সুন্নি আলেমকে হত্যা করেছে দায়েশ। সৌদি আরব কিংবা অন্যান্য আরব দেশগুলো যদি এতই সুন্নি-প্রিয় দেশ হবে তাহলে তারা কেন মিসরের সুন্নি প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তা দিল? কেন মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল আর শত শত কোটি ডলার দিয়ে জেনারেল সিসিকে লালন-পালন করছে? এসব প্রশ্ন থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়- আসলে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্ররা কী চায়। এদের চরেরা যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের জিগির তুলেছে তা মোটেই বাস্তব নয়; এটা শুধু মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার কৌশল। সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং মিসরের মুরসি উৎখাত- কোনো ইস্যুই শিয়া-সুন্নির সঙ্গে জড়িত নয়।
৬.

সস্ত্রীক এরদোগান ও বাশার আসাদ
এবার আসুন তুরস্ক প্রসঙ্গে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান একসময় শিয়া আসাদকে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনিই আমেরিকার ইন্ধনে আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। শুধু তাই নয়, বাশারকে ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ তার উচিত ছিল প্রতিবেশি দেশটির সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করা।
যদি মনে করে এরদোগান একজন সুন্নি হিসেবে বাশারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাহলে একটা প্রশ্ন এসে যায়। প্রশ্নটি হলো- এরদোগান কেন শত শত কুর্দিকে হত্যা করছেন- তারা তো সুন্নি? হয়ত বলবেন কুর্দিরা সন্ত্রাসী। তাহলে বাশার আসাদও তো বলতে পারে দায়েশ, আন-নুসরাগোষ্ঠী, ফ্রি সিরিয়ান আর্মি সন্ত্রাসী। তাদের দমন করা সরকারের দায়িত্ব।
৭.
সিরিয়ায় বাশার আসাদ বিরোধীদের মধ্যে কয়জন ইখওয়ানের? সিরিয়া যুদ্ধ শুরুর পর দেখেছি বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে একজন খ্রিস্টান! এমনটি হলো কেন? ইখওয়ানরা কোথায়? ইখওয়ানের নীতিতে তো অস্ত্র হাতে নেয়ার নজীর নাই। এমনটি থাকলে তো মিশরে অস্ত্র তুলে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা তা করে নাই। তাহলে সিরিয়ায় কেন ইখওয়ানের অজুহাত দেয়া হচ্ছে?
৮.
বাশার আসাদের বিরুদ্ধে গোষ্ঠী পশ্চিমা ও ইহুদি মিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালাচ্ছে। আমাদের দেশের মিডিয়াও তাদের পরিবেশিত খবরগুলোই অনুবাদ করে প্রচার করে। বাশারকে নৃশংস, বর্বর হিসেবে তুলে ধরতে পশ্চিমাদের চেষ্টা সফল হয়েছে কারণ তাদের সঙ্গে সুর মেলাতে দেখি আপনাদেরকে। সিরিয়ায় চার/পাঁচ লোক নিহত হয়েছে যার অধিকাংশই বাশার সমর্থক। তাদেরও কি বাশার হত্যা করেছে? আপনারা কেন দায়েশ সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর বর্বরতা চোখে দেখেন না?
৯. বাশার সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী হয়ে যদি সিরিয়ার ক্ষমতায় থাকার অধিকার না রাখেন তাহলে বাহরাইনের সংখ্যালঘু সুন্নি শাসক কিভাবে ক্ষমতায় থাকে? গত চার দশক ধরে আলে খলিফা সরকার বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মুসলমানের ওপর অত্যাচারের স্ট্রিমরোলার চালাচ্ছে। ওই স্বৈরশাসককে সৈন্য দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে সৌদি আরব। আর মদদ দিচ্ছে আমেরিকা-ইসরাইল। সেখানেসহ আরব দেশগুলোতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কেন আমেরিকা-ইসরাইল হামলা চালায় না? কেন তাদের টার্গেট কেবল বাশার আসাদ- আশা করি আল্লাহর দেয়া মগজটাকে কাজে লাগাবেন।
১০. প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও তার সহচরদের এমন শক্ত অবস্থানের তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ হচ্ছে- আরব ভূখণ্ডে ইসরাইল নামক যে রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছে তা অনেক আরব দেশ মেনে নিলেও সিরিয়া আজ পর্যন্ত মেনে নেয়নি। বরং ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ বাদেও সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের পিতা হাফেজ আল-আসাদ এবং মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত আলাদা চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭৩ সালে ইসরাইল-বিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তবে সে যুদ্ধে আনোয়ার সাদাত পিছু না হটলে হয়ত আজকে ইসরাইলের ইতিহাস ভিন্ন হতো। আনোয়ার সাদাত পিছু হটলেও অবস্থান থেকে সরে যাননি হাফেজ আল-আসাদ কিংবা তার ছেলে বাশার আল-আসাদ। মিসর, তুরস্ক কিংবা অন্য অনেক আরব দেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও আজ পর্যন্ত সিরিয়া তা করেনি বরং সিরিয়া মনে করে আলোচনার মাধ্যমে ইসরাইল কখনো স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনে রাজি হবে না; ফিলিস্তিনিকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় হলো সশস্ত্র যুদ্ধ।

দ্বিতীয় যে কারণ তা হলো- সিরিয়া হচ্ছে একমাত্র আরব দেশ যে কিনা পশ্চিমা বৃত্তের বাইরে গিয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারে সহায়তা দিয়েছে। আর এ কাজ করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পিতা হাফেজ আল-আসাদ। তিনি ১৯৭০ সালে ক্ষমতায় আসার ১০ সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া সফরে যান এবং ইসরাইল-বিরোধী লড়াইয়ের জন্য সোভিয়েত সরকারের কাছে সামরিক সহায়তা চান। বিনিময়ে তিনি সিরিয়ার উপকূলে রাশিয়াকে স্থায়ী নৌঘাঁটি করার সুবিধা দিতে রাজি হন। যে ঘাঁটি আজও রয়েছে।

তৃতীয় যে কারণে সিরিয়ার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে পশ্চিমারা তা হলো- ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র বন্ধু হিসেবে ইরানের পাশে ছিল সিরিয়া। যখন সাদ্দামকে দিয়ে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়েছিল এবং সে আগ্রাসন অন্য আরব দেশগুলো অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে ইরাককে সাহায্য করেছে তখনও সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদ ইরানের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন।
মূলত এ তিনটি কারণে বাশার আসাদকে টার্গেট করেছে আমেরিকা। বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করা গেলে ইরানকে ঘায়েল করা সহজ হবে- এ চিন্তা থেকেই তারা আগ্রাসন শুরু করেছে। আমেরিকা তার মিত্র সৌদি আরব ও তুরস্ককে সামনে গিয়ে এ নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে বলে অনেক সহজ সরল মুসলমান তা বুঝতে পারছে না। তারা ট্রাম্পের আগ্রাসনকে স্বাগত জানাচ্ছে। এটা যে কতটা আত্মঘাতী চিন্তা তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী, রেডিও তেহরান, ইরান।

মন্তব্য করুন

উপরে