আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > আলোড়ন > ”প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের লিডার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু…”

”প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের লিডার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু…”

শেখ আদনান ফাহাদ:


জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে হত্যা করা হয়েছে, এমন সংবাদে চমকে উঠার বয়স তখনো আমার হয়নি। কেবলই জন্ম হয়েছিল আমার। সামরিক শাসনের কবলে থাকা বাংলাদেশের কোনো এক বর্ষণমুখর দিনে আমার জন্ম কালীকচ্ছের শেখাবাদে। সামরিক শাসন কী, জিয়া বা এরশাদ কতখানি স্বৈরতান্ত্রিক সেটি বোঝার ক্ষমতা আমাদের ছোটবেলায় তখনো হয়ে উঠেনি। মুক্তিযোদ্ধা বাবা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড় ভাই-বোনেরা আমার মাঝে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতেন। বাড়ীতে রাজনীতিবিদ বলতে আমরা কেবল বঙ্গবন্ধুর নাম আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতাম। যদিও বাংলাদেশ টেলিভিশন খুললেই দেখতাম, জেনারেল এরশাদ বন্যার পানি ভেঙ্গে হাঁটছেন, আর নেপথ্য সংগীতে গাওয়া হচ্ছে-‘তোমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি আমি আজ’ জাতীয় গান! তখন মনে হত, এরশাদের মত ভালো মানুষ আর হয় না! পরিবারে আর্থিক দারিদ্র থাকলেও গ্রামের সুন্দর, সাবলীল ও সহজ পরিবেশ আর শিক্ষিত বাবা-মার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দারিদ্র আমাদেরকে আগলে রাখত অস্তিত্ব-সঙ্কটমুক্ত বর্তমান আর সম্মানজনক ভবিষ্যতের হাতছানির খোলা বৃত্তে।

ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা ভাবত, ফাহাদকে পেছনে ফেলা সম্ভব না। মাঠের বোলারটি ভাবত, ফাহাদ/ফাহাদ ভাই এত জোরে মারে কেন? মসজিদের মসুল্লিরা ভাবত, এর মত ভালো ছেলে হয় না! গ্রামের এই ভালো ছেলেটি যখন ঢাকায় ঢাকা কলেজে ভর্তি হল, তার মধ্যে পরিবর্তন আসল বেশ। মারামারির নেশা পেয়ে বসল তার। বন্ধুকে বা কলেজের কাউকে কেউ অপমান করেছে শুনলেই সে অন্যান্যদের নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হত। তবে ঢাকা কলেজেও খেলাধুলার সেই পুরনো অভ্যাস তাকে আগলে রাখল। তবু এসএসসির মত বোর্ড স্ট্যান্ড করতে পারল না সে। কোনোমতে প্রথম বিভাগে পাশ করল। তবু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে না, এমনটা সে কোনোদিনও ভাবতে পারেনি। মনে হত, সে যদি চান্স না পায়, তাহলে কে পাবে এই বাংলাদেশে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেল ছেলেটি।

সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলাম। ক্লাসে ভালো না লাগায় মাস তিনেক পর সাংবাদিকতায় চলে গেলাম। কী মনে করে যেন, এ এফ রহমান হলেই থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম। এএফ রহমান হলে ক্লাসের প্রথম দিন থেকেই থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। তারপর লম্বা সময়। ২০০০-২০০৭। এই সাত বছর অনেক সঙ্কট গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের সঙ্কট তো আছেই, বহু জাতীয় সঙ্কট। এরপরেও এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নতুন করে শিক্ষিত করেছে। আমাকে ভবিষ্যতে সমাজ-সংসারে টিকে থাকার অবলম্বন দিয়েছে। আজ পেছন ফিরে বা ভবিষ্যতের পানে তাকালে মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নতুন করে জন্ম দিয়েছিল। গভীর রাতে হলে ফিরে শান্তিতে কয়েকঘণ্টা বিশ্রাম নিতে দিয়েছে। তপ্ত দুপুরে ছাদের নিচে আশ্রয় দিয়েছে। যখন ইচ্ছা তখন টেলিভিশন দেখার সুযোগ দিয়েছে। একসাথে ১০/১২টি ইংরেজি/বাংলা পত্রিকা পড়ার সুযোগ দিয়েছে। খুব কম খরচে তিন বেলা খাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। লাইব্রেরিতে হাজার হাজার বই পড়ার সুযোগ দিয়েছে (এই সুযোগ নেয়া হয়নি)।

বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলা, ঝগড়া করার, ভালো লাগার সুযোগ করে দিয়েছে। বড় বড় গানের শিল্পী, কথার শিল্পী, খেলোয়াড়, ছাত্রনেতাদের সাথে মেলামেশা করার সুযোগ দিয়েছে। আমি সাংবাদিক সমিতির ভেতরে ঘুমিয়েছি, আড্ডা মেরেছি, গান শুনেছি, গেয়েছি। সঙ্কটকালীন দ্রুত নিউজ লিখে ফ্যাক্স করার সুযোগ পেয়েছি। বিনিময়ে সামান্য মজুরি পেয়ে নিজের খরচ নিজেই বহন করার সুযোগ পেয়েছি। ভালো-মন্দ নানা বিষয়ের অধ্যাপকদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। হুমায়ুন আজাদকে পেয়েছি, আরেফিন সিদ্দিককে পেয়েছি। টিএসসিতে সঞ্জিবদার গান শোনে ভেবেছি, লোকটা কি উন্মাদ নাকি! চারপাশে ছাত্রদলের ক্যাডার! অথচ তিনি জিয়াউর রহমানের গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন গানের ফাঁকে ফাঁকে রক্ত গরম করা কথায় কথায়।

যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নতুন পরিচয় দিল, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিনে তাঁকে অভিনন্দন না জানালে নিজেকে বেঈমান বলে মনে হবে। একজন আপাতত প্রবাসী, জ্ঞানীজনের পোস্ট পড়ে মনে হল, তাঁকে পুরনো রোগ পেয়ে বসেছে। যতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, ততদিন এর চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। যেই বাংলাদেশ ছেড়ে একটু বাইরে যাবে তখনই শুরু হয় বিষেদগার। কাল যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনা/দুর্ঘটনার জন্ম দিল, এরা সংখ্যায় কত? ১০০০/২০০০ জন? অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ৪০,০০০ ছাত্র-ছাত্রী। সবাই তো আর বিসিএস ক্যাডার হবে না বা ছাত্রলীগের নেতা হবে না। অল্প সংখ্যক এর দ্বারা সৃষ্ট একটি ঘটনার জন্য পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘৃণা করার মধ্যে এক ধরণের বেঈমানি প্রকাশ পাচ্ছে। সেই দলে থাকতে চাইনা বলেই এই দীর্ঘ বক্তব্য।

বাংলাদেশের জন্মের পেছনে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি অবদান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের লিডার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে গবেষণাকর্ম ও রাষ্ট্রীয় উৎপাদন কাঠামোতে এই লিডার প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। শীঘ্রই না পারার কারণগুলো চিহ্নিত করা দরকার। না হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে কখনোই শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারবে না। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই অবস্থা। সবচেয়ে ভালো ছাত্রদের প্রতিষ্ঠান বলে পরিচিত বুয়েটের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও প্রকট হবে। ভালো ছাত্ররা ভালো সনদ নিয়েই বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে! দেশের মানুষের টাকায় পড়াশুনা শেষ করে যখন দেশকে পাল্টা কিছু দেয়ার সময় হয় তখনই মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমায়। আমাদের মেধায় এগিয়ে যায় অন্যরা। আর যারা দেশে থেকে যাচ্ছে, তাদের বড় অংশ এখন শুধু ম্যাজিস্ট্রেট আর পুলিশ হতে চায়। অথবা আর্মি, নেভি বা নৌ বাহিনীর অফিসার হলেও সমাজে সবাই বেশ সমীহ করে। তুলনামূলকভাবে গানের শিল্পী, চিত্রশিল্পী, নাট্যশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, শিক্ষকদেরকে রাষ্ট্র কিংবা সমাজ খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না। আরও ভয়ের বিষয় হল, সবার উপরে থাকা রাজনীতিবিদদের মধ্যে নিম্নমানের মানুষের সংখ্যাই বেশি। সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলো সমাজে স্ব স্ব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারছে না। মাইক্রো বায়োলজিতে ফার্স্ট, বুয়েট, মেডিক্যাল থেকে বের হওয়া ছেলে বা মেয়েটিও যখন শুধু এএসপি বা ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার চেষ্টায় মত্ত হয় তখন বুঝে নিতে হবে এই সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। একবার ভাবুন, দেশে বিজ্ঞানী নেই, ইঞ্জিনিয়ার নেই, শিক্ষক নেই, ডাক্তার নেই, কৃষক নেই, উদ্যোক্তা নেই; সবাই পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেট! সে সমাজ কতদূর এগোতে পারে?

শুধু অতীতের অর্জনের গল্প বলে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিন পার করতে পারবে? বর্তমান কাঠামোতে সরকারি চাকরি হয়ত হয়ে যাচ্ছে কারো কারো। যে সরকারি চাকরি পায় সে মাসে রেগুলার বেতন পায়, উৎসব ভাতা পায়। কিন্তু বাকিদের কী অবস্থা? সাংবাদিক ভালো আছে কি না, শিল্পীরা ভালো আছে কি না, ডাক্তারদের সম্মান, নিরাপত্তা আছে কি না, ইঞ্জিনিয়ারদের সৎভাবে কাজ করার সুযোগ আছে কি না, এগুলো নিয়ে ভাবার সময় এসে পড়েছে। এমন চললে কি কোনোদিন বাংলাদেশ বিশ্বের সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের তালিকায় যেতে পারবে? কিছু মানুষ ভালো থাকবে, সম্মান পাবে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষের অধিকার থাকবে না একটু ভালো চলার, ভালা বাঁচার। এভাবে বেশি দূর এগুনো যাবে না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

মন্তব্য করুন

উপরে