আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > আলোড়ন > কোটা সংস্কারের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জোরালো অবস্থান

কোটা সংস্কারের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জোরালো অবস্থান

মাহমুদুল হক সোহাগ, প্রাচ্যনিউজ


বিসিএস পরীক্ষাসহ সকল প্রকার সরকারি-বেসরকারি নিয়োগে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কার ও শিথিল করার দাবিতে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাধারন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী সাবেক শিক্ষার্থীরা।
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রায় পাঁচ শতাধীক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সাথে সমর্থন জানিয়ে মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরাও।

মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানগণ বক্তব্য প্রদান করেন। মানববন্ধনের শুরুতেই অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের উপর বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বক্তারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন,‘বর্তমানে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেভাবে বিভিন্ন কোটা দেওয়া হচ্ছে, তাতে প্রকৃত মেধাবীরা অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন। তাই আমাদের দাবি, মেধার ভিত্তিতে অন্তত ৯০ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হোক। বাকি ১০ শতাংশ নিয়োগ কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া যেতে পারে।’

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে মানবন্ধনের সাথে সংহতি পোষণ করে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ বলেন, আমরা সকলেই একটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চাই, মানবিক রাষ্ট্রের নাগরিক হতে চাই, সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা চাই। সমতাভিত্তিক সেই মানবিক রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে আমরা যদি কায়েমী স্বার্থবাদী হয়, তাহলে কথনো স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে না।’ তাঁর বক্তব্য বিপুল পরিমাণ করতালি দিয়ে স্বাগত জানায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু হামেদের সন্তান শেখ আদনান ফাহাদ আরো বলেন, ‘আমার আব্বার মুক্তিযোদ্ধা সনদ থাকার পরেও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ব্যবহার করিনি। চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রশ্নই উঠেনা। আমার ছেলের জন্য আমি কোনো কোটা চাইনা। আমার ছেলের জন্য কোটা থাকলে সেটি আমার জন্য অত্যন্ত লজ্জার। কোটা থাকলে শুধু গরীব কৃষকের থাকতে পারে। একেবারেই শুধু গরীব, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর সন্তান-সন্ততির জন্য থাকতে পারে।’ তাঁর এ বক্তব্যে উপস্থিত শত শত শিক্ষার্থীরা উদ্বেলিত হয় বলে আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
তিনি বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমার বাবা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্যই নিঃস্বার্থে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। এত বছর পরে এসেও আমি কেনো আমার ছেলে জন্য, মেয়ের জন্য নাতি-নাতনি কোটা চাইবো? কোটায় সুবিধাভোগী অবস্থানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই যদি সারাজীবন কোট সুবিধা ভোগ করতে চাই, তাহলে গ্রাম থেকে উঠে আসা কৃষকের মেধাবী সন্তানরা কোথায় গিয়ে দাড়াবে? সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাসী হবে, তারা অন্যের দুঃখে কষ্টে কখনো নিজেকে স্বার্থপরের মতো ভালো রাখার চেষ্টা করবে না। আমার নৈতিক অবস্থান থেকে বর্তমানে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থান সংস্কার দাবি করছি।’

আরেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তানভীর হোসাইন বলেন,‘মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশকে স্বাধীন করেছে শুধুমাত্র প্রতিদান পাওয়া জন্য নয়। দেশকে স্বাধীন করেছে দেশটি যেনো উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, সকল সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে বিশ্বের বুকে দেশটি যেনো মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারে। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা, তিনিও চান মেধার যেনো মূল্যায়ন হয়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, কোটা ব্যবস্থা চিরস্থায়ীভাবে থাকতে পারে না। চলমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কার দরকার। আমি চাই ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমিয়ে যেনো ১০ শতাংশে আনা হয়। কোটা ব্যবস্থা যদি নাতি-নাতনি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয় তাহলে এটি একটি দীর্ঘ বৈষম্যে গিয়ে দাড়াবে।’


সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন বলেন,‘ মেধার বিকল্প কেবল মেধাই হতে পারে। যদি রাষ্ট্রিয় প্রশাসন প্রকৃত মেধাবীদের দ্বারা পরিচালিত না হয়, তাহওে এর বিরুপ প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাবো। যদি কোন বা রাষ্ট্রে সামাজিক বৈষম্য বিরাজ করে সে কারনে মানুষ অনেক বৈষম্যের শিকার হয় এবং তার মেধাকে বিকশিত করতে পারে না। তখন তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেই বিশেষ ব্যবস্থা তো অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না।

কোটাকে একটি বিশেষ সুবিধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোটা কখনো আইন হতে পারে না। কোটা হচ্ছে একটি সুবিধা, সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের জন্য। মেধাবীদের বঞ্চিত না করে সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণিরা কেনো পিছিয়ে আছে সেজন্য সরকারকে কাজ করতে হবে।’

সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দের পক্ষে মানববন্ধনের আহ্বায়ক সুলতান আজিজুল বলেন,“সমগ্র বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলনের সাথে আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একাত্মতা পোষণ করছি। আমরা কোটা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপক্ষে না। দেশের মাত্র ২শতাংশ লোকের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান রয়েছে। ৫৬ শতাংশ কোটার রাখার কারণে প্রকৃত মেধাবীরা যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোটা কমিয়ে ১০ শতাংশতে নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছি। মূলত মেধাবীরা যাতে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক জায়গায় যেতে পারে, এজন্য কোটা সংস্কারের দাবিতে আমাদের আন্দোলন।”
এর আগে চলমান কোটা সংস্কারের আন্দোলন কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়ে গত রোববার ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে অংশগ্রহণ করেন লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সালেক মুহিদ।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে কোটা সংস্কার দাবিতে তিনি বলেন, “অসম ও অযৌক্তিক কোটা ব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে এক কৃত্তিম সংকট তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা কখনও চান না তাদের কোটা সুবিধা গ্রহণের কারণে দেশটা অযোগ্য ও দুর্বল নেতৃত্বের হাতে পরিচালিত হোক।”

চাকরির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সমতার দাবি জানিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলেন, “আজকে যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান রয়েছে তাদের সকলেরই উচিৎ মেধাবীদের মূল্যায়ন ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই মানববন্ধনের সাথে একাগ্রতা পোষণ করা। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তার হিসেবে তখনই লজ্জিত হই, যখন দেখি দেশের উন্নয়নের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে কোটার পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যায়।”

মানববন্ধনে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে শতকরা ৫৬ ভাগ থেকে ১০ ভাগে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না থাকলে শূন্য পদগুলোতে মেধা তালিকা ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার বন্ধ করা, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া এবং চাকরির পরীক্ষায় সবার জন্য অভিন্ন নাম্বার কর্তন ও বয়সসীমা রাখাসহ কোটা সংস্কারের পক্ষে বিভিন্ন দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ৫ নভেম্বর এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, আধাসরকারি, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা এবং ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত মহিলাদের জন্য কোটা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে এই কোটা পদ্ধতির সংস্কার, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ কোটা পদ্ধতি চালু আছে। সব মিলিয়ে শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা পদ্ধতি রয়েছে। অপরেিদক বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৩০ লাখ। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ বেকারই হচ্ছে স্নাতক(সম্মান) ডিগ্রিধারী। এ ছাড়া ১৯৭২ সালে যখন কোটা পদ্ধতি চালু হয় তখন দেশে জেলার সংখ্যা ছিল ১৭টি, এখন দেশে ৬৪টি জেলাতে উন্নিত হয়েছে।
ছবি/ সোহাগ।

মন্তব্য করুন

উপরে