আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > ইতিহাস-ঐতিহ্য > কাঠমিস্ত্রিদের সঙ্গে আলাপ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ

কাঠমিস্ত্রিদের সঙ্গে আলাপ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ

আমাদের হলে পুরোনো জানালা খুলে নতুন করা হচ্ছে। কয়েকজন কাঠমিস্ত্রি কাজ করছেন।দলের প্রধান জনের নাম মাধব কুমার।তিনি আমাদের ব্লকে কাজ করছেন আব্দুল হাকিম নামের সহকর্মীকে নিয়ে। আমার রুমের পাশে বসে কাঠ কাটা, চাছা ও জানালা বানানো চলছে।তাদের সঙ্গে কথা বললাম। কারণ বাঙালির সহস্র বছরের পুরোনো পেশার মধ্যে এটি একটি। এখন ইট-কংক্রিটের কৃত্রিমতার যুগে প্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ততাহীন আমরা কাঠ ও মানুষের জীবনের নিবিড় সম্পর্কের কথা জানিনা। তাদের কাছ থেকে জানলাম কিভাবে ঘরে কাঠের তৈরি কিছু থাকলে তা প্রশান্তি আনে। যে ঘরে কাঠের জিনিস আছে সেখানে নাকি অতিরিক্ত গরম টিকতে পারেনা। অর্থাৎ বৃক্ষ-কাঠ কেবল অক্সিজেন না, প্রাকৃতিক এসি হিসেবেও কাজ করে। সবচেয়ে ভাল লাগলো যখন আব্দুল হাকিমকে বললাম, তার সাথে উস্তাদ মাধবের কেমন সম্পর্ক? তিনি বললেন, খুব ভাল। হিন্দু-মুসলমান হইলেও আমরা এক লগেই থাকি। আজান দিলে মাধব দা আমারে আরো ডাইকা কয়, নামাজে যা, না হলে পাপ হবে। শুনলাম, মাধবদার বাড়িতে পূজায়ও দাওয়াত দেয় হাকিমকে।


আমি যখন বললাম যে অনেক সময় হিন্দু-মুসলিম ঝগড়া বাঁধায় অনেকে, তারা দুইজনেই বললেন এসব তাদের মধ্যে হয়না। ‘আমরা যার যার ধর্ম পালন করি। কাজের সময় কাজ করি, মেলামেশা করি।’ এই যে অকৃত্রিম সম্পর্ক, এই সম্পর্কই বাঙালির জীবন। নিম্নবিত্ত কখনোই সাম্প্রদায়িকতা ধারণ করেনা। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে আছে পশ্চিমা শিক্ষায শিক্ষত শ্যুট, টাই, জিন্সের আড়ালে। মাধব আর হাকিমরা কোনকালে কোন দাঙার নেতৃত্ব দেয়নি। দাঙা বাঁধায় যারা তারা আমার আপনার আশেপাশেই থাকে, স্যেকুলারিজমের আড়ালে ধর্মীয় বিদ্বেষ তৈরি করে। সংখ্যালঘুর রাজনৈতিক অর্থনীতির সুবিধা ভোগ করে। সেখানে মাধব বা হাকিমরা থাকেনা। তারা কাজ করে, খায়, বাংলার গান গায় এবং দিন শেষ হলে এই বাংলার মাটিতে ঘুমায় অথবা এই বাংলার বাতাসের সঙ্গে পুড়ে মিশে যায়। এটাই বাংলাদেশ। এখানে হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই। সবাই আমরা বাংলাদেশী, সবাই একেকটা বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ।

লেখক: মঈনুল রাকীব

মন্তব্য করুন

উপরে