আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > আলোড়ন > কবিতা মানুষকে স্বপ্নবাজ করে তোলেঃ মাসুম মুনাওয়ার

কবিতা মানুষকে স্বপ্নবাজ করে তোলেঃ মাসুম মুনাওয়ার

জুতা দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর কেউ যদি উল্টিয়ে দেখতে চান তিনি দুটো বিষয় দেখতে পাবেন। একটি নির্মম সৌন্দর্য্য, অন্যটি রাস্তার ময়লা। কেউ এটিকে তুচ্ছ ভাবতে পারেন আবার কেউ এর মধ্যে খুঁজতে পারেন সৌন্দর্য্য। বিষয়টি ব্যক্তির দৃষ্টির গভীরতার উপর নির্ভর করে।

যিনি কবি তিনি তার চারপাশটাকে দেখতে পান। যিনি দেখেন তিনিই দ্রষ্টা। কিন্তু কবি দেখেন নিবিড় অনুভূতির দর্শন দিয়ে তৃতীয় চোখে সাধারণের থেকে আলাদাভাবে আর সেভাবেই প্রকাশ করেন। এখানেই সাধারণের সাথে কবির পার্থক্য। কবি খুঁজেন সত্য, সুন্দর, সরলতা, বিশালতা ও বক্রতার মাঝে কোমলতা। কবি তার দৃষ্টিতেই কবি। রুচিতেই কবি।

জীবনানন্দের মতে কেউ কেউ কবি, সবাই কবি নন। এই কেউ কেউটা কবির দৃষ্টির তীক্ষ্মতায় সৃষ্টি। কবি দরদ, প্রজ্ঞা, রুচি, আচার, ক্রুরতা, সরলতা, কোমলতা ও জীবন মিশে তাঁর তীব্র আবেগগুলোর সম্মিলনে প্রেম ও ভালোবাসাকে সঙ্গে নিয়ে কবিতা রচনা করেন। যিনি ভাবনাগুলোর মধ্যের গভীর সৌন্দর্য্যকে উপমা, উৎপ্রেক্ষা নানান শব্দের ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেন।

ছোট বেলায় মা যখন ভালো কিছু রান্না করতেন মাঝে মাঝেই চুরি করে খেয়ে নিতাম। আজ মনে হয় মায়ের রান্নার সুঘ্রাণই কবিতা। যা আমাকে সুন্দর কিছু গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছে।

জীবনের প্রতিটা পরতে পরতে কবিতা। জীবন ও কর্মের নানামুখী ভাবনার নান্দনিক উপস্থাপনাই কবিতা। যা মানুষকে স্বপ্নবান করে তোলে। এই স্বপ্ন জয় করার। নিরাশার মাঝে আশার। হতাশার মাঝে সাহসের।

আমার কাছে কবিতা হলো যাবতীয় সৌন্দর্য্যরে আধার। কবি হলেন এই নান্দনিক সৌন্দর্য্যরে নির্মাতা। কবিতা শব্দ বা উপমারও অধিক কিছু। কবিতা একটা জাতিকে স্বপ্ন দেখায়। কবি হলেন আমার কাছে যাদুকর। বাস্তবিক স্বপ্নের যাদুকর। ফলে কবিতায় নৈরাশ্যের মধ্যেও স্বাপ্নিক আশাবাদকেই আমরা লক্ষ্য করি।

15032892_929602477140175_9141248453196663176_nকবি মাসুম মুনাওয়ার

একজন কবি একটা জাতিকে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে স্বপ্ন দেখাতে জানেন। কোন অকবির পক্ষে তা সম্ভব নয়। এখানেই কবি অকবি বা প্রকৃত কবির প্রশ্ন। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে। যিনি কবি তিনি নানান ভাবে একটা জাতিকে জাগাতে পারেন। অকবি এখানে ব্যর্থ হন। ফলে অকবি ঝরে যান। পাঠকের থেকে তার বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তিনি ছিটকে পড়েন তার স্তুতি নিয়ে। কিছুদিন হয়তো অকবির কবিতা মানুষ পড়েন তারপর আসতে আসতে ভুলে যান। তার পৃষ্ঠা আর কেউ উল্টান না। কেউ তাকে মনে রাখেন না। তাদের স্তুতি গুলো হারিয়ে যায়।  কবির কালাম বা বাণীগুলো ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ থেকে মানুষের নিকট, সমাজ থেকে সমাজের ভিতর, রাষ্ট্র থেকে বিরাষ্ট্রে। এক ভাষার কবি তখন সব ভাষার কবি হয়ে ওঠেন। তখন কবি র্নিদিষ্ট ভাষার থাকেন না। দেশের থাকেন না। তিনি সকলের। কবিই কেবল সকলের হতে পারেন অকবি নয়।

একটা প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কবি আর অকবি কেমনে বুঝবো? এর উত্তরটা আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। কোন সুন্দরকে দেখিয়ে বলতে হয় না যে এটা সুন্দর। মানুষের ভিতর থেকেই এক তৃপ্তি বোধের জোয়ার জাগে মনে। যার মাপকাটিতে মানুষ কবিকে চিনেন। হ্যাঁ ব্যক্তি বিশেষে এর পার্থক্য থাকলেও অনেকের কাছেই তা সুন্দর হিসেবেই দেখা দেয়। তখনি ব্যক্তি তাকে আপন করে নেন বা চিরদিনের জন্যে মন থেকে মুছে দেন। যে কারণে কয়েক হাজার বছর আগের কবিতাও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। মানুষ হয়তো কবির নাম ভুলে যায় কিন্তু তার কালাম গুলো তারা মনে রাখে। ব্যবহার করে। হৃদয়ে ধারণ করে ফেরে। এই কালাম চিরায়ত কালাম। মধুর বাণী। যেকোন শিল্পেই এই সৌন্দর্য যখন উপস্থিত হয় তখন সেই শিল্পটিও মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।

কবিতা বোঝার কিছু নেই। আজকাল একথা খুব শোনা যায়। এটা দুর্বল কবিদের প্রচারণা মাত্র। প্রকৃত কবিতা ঠিকই পাঠক মনকে ছুঁয়ে যায়। পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। তার মধ্যে যতই আড়াল থাকুক। কবিতার সৌন্দর্যই পাঠকের মনে কবিতাকে স্থান দেয়? একারণেই আমি কবিতা বলতে বুঝি সৌন্দর্য। সৌন্দর্যের নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। যা মানুষকে স্পর্শ করে। হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। মানুষকে স্বপ্নবাজ করে তোলে। ভাবায়, ভাবতে শেখায়। লালনের কালামের কথা আমরা বলতে পারি।

পাশ্চাত্য ধারার আধুনিক কবিতার যে প্রচলন বাংলা কবিতায় চলছে আমি মনে করি বাংলা কবিতার মৌলিক রঙ সেখানে নেই। বাংলা কবিতা তার থেকেও অধিক। বাংলা কবিতা পুঁথি, কবিগান, জারিগান, বাউল গান, পালাগান, বিচ্ছেদ এমন আরো কিছু ধারার বহন করুক। যেগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। আমাদের নতুন প্রজন্মকে ভাবতেই হবে কিভাবে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবো।

আমি মনে করি আমরা যদি লালন, হাসন, রাধারমণ, উকিল মুন্সী,  রশিদ উদ্দীন, জালাল খাঁ কিংবা রাজ্জাক দেওয়ানের উত্তরাধিকারকে বহন করে চলতে পারি তবেই বাংলা কবিতা তার মৌলিক রঙ খুঁজে পাবে। সময়ের কবি সময়ের ভাষাতেই লিখবেন। তবে তিনি চিহ্নিত রক্তের উত্তরাধিকারকে জেনে বুঝেই লিখবেন। এতে ইউরোপিয় আধুনিক কবিতার চর্চার পথে না গিয়ে আমরা বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারের পথ পাবো।

এই ধ্যানে বসে আমিও ভাবি আমার কবিতা পাবে তেমনি রুপ উকিলের সোনালী সৌন্দর্য্য।

লেখক পরিচিতঃ মাসুম মুনাওয়ার  প্রধানত কবি । তবে তিনি সমালোচনাও লিখে থাকেন। সমসাময়িক সময়কে তিনি কাব্যিক ছন্দে ধরে রাখেন বাঙালির নিজস্ব জীবনধারা দিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪০ তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মাসুম মুনাওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সংগঠন চিরকুটের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তিনি। ২০১৬ এর অমর একুশে বই মেলায় প্রকাশিত ‘‘ সূর্যকুসুম” নামের কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি কবি হিসেবে তারঁ শক্তিশালী আবির্ভাব জানিয়ে দেন সাহিত্যমহলে।

৩ thoughts on “কবিতা মানুষকে স্বপ্নবাজ করে তোলেঃ মাসুম মুনাওয়ার

মন্তব্য করুন

উপরে