আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > আলোড়ন > ইসলামকে পাশ কাটায়ে চলা নিরেট বেকুবি

ইসলামকে পাশ কাটায়ে চলা নিরেট বেকুবি

পিনাকী ভট্টাচার্যঃ  হেফাজত নিয়ে যারা আমার ভুল পাঠ করতেছেন তাঁদের জন্য কিছু লেখা দরকার। আমি আগেও বলছি অনেকবার কিন্তু ফেবুর লেখা হারায়ে যায়। এমনভাবে হারায় যে আগে যারা সে লেখা দেখেন নাই তারা মনে করেন আমি এই কথা কখনো কই নাই।
যাই হোক, আমার ফেবু বন্ধু ইমতিয়াজ মির্যা কয়েকদিন আগে লিখেছিলেন আমি হেফাজতরে ভয়েস দিতেছি। আমি খুব পরিস্কারভাবে বলছি হেফাজতের আমার ভয়েসের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নাই। উনারা নিজেরাই নিজেদের ভয়েস দিতে যথেষ্ট সক্ষম।
হেফাজত তার নিজের কথা ঢাকা শহরে এসে আর সবার মত জমায়েত হয়ে বলবার অধিকার আছে বলে আমি মনে করি আর তা আমি সমর্থন করি। সার কথা হল তাদেরও বক্তব্য ও দাবী দাওয়া শান্তিপুর্ণভাবে তাদের মত বলতে দিতে হবে বলে মনে করি। আর এই সমর্থনের অর্থ এই না যে এই দাবীকে সমর্থন করতে হলে আমাকে হেফাজত ইসলাম সংগঠনের সদস্য হতে হবে। এটা আপনিও করতে পারেন, কারণ এটা সিভিল রাইট। ইমতিয়াজ মির্যা আবার কয়েকদিন আগে বললেন, আমি নাকি হেফাজতের সাফাই গাই।

এই মন্তব্যটাও বিপদজনক, কারণ এভাবে বললে, হেফাজতকে যেন এক অপরাধী সংগঠন বলে আগাম অনুমানের ইঙ্গিত হয়ে যেতে পারে এবং তিনি এর ভিত্তিতেই মনে করছেন যেন তাঁদের অপরাধ ঢাকার জন্য সাফাইয়ের দরকার আছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাসকে অগ্রসর করতে হলে, বিভাজনের বিপদজনক রাজনীতিকে উৎরে যেতে হলে। ইসলামের প্রশ্নটিকে মীমাংসা না করে, ডায়লগ না করে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।
ইউরোপকেও এই কাজ করতে হয়েছিল। আজও করতে হয়। আগামীতেও করতে হবে। মার্কস বলেছিলেন, ধর্মের পর্যালোচনা মানুষের অন্য যে কোন বিষয় পর্যালোচনার পূর্বশর্ত। ধর্মের পর্যালোচনার অর্থ হচ্ছে বিশ্লেষণ করে দেখা ধর্মের কোন কোন ধারণা ও বিষয়কে আরো সার্বজনীন করে আমাদের ভবিষ্যতের পথচলায় সাথী করে নেয়া যায়।

আমরা কি আমাদের ধর্মের পর্যালোচনা শেষ করতে পেরেছি? পারি নাই। স্যেকুলারেরা মনে করে ১৯৭১ এ ইসলামের সাথে স্যেকুলারদের মোকাবেলা হয়ে গেছে। ধর্মের সাথে রাজনৈতিক ফয়সালা হয়ে গেছে। হয় নাই। তাই ধর্ম প্রশ্নটি যতদিন উপেক্ষিত হতে থাকবে ততদিন ধর্ম বারেবারে বিপুল শক্তি নিয়ে আবির্ভুত হবে।
আমাদের স্যেকুলারেরা ধর্মের পর্যালোচনা বলতে এখন পর্যন্ত যা বুঝেছে, তা হচ্ছে সেই ইউরোপীয় যা আদতে খ্রিস্টিয় পরিমণ্ডল তাতে বসে তাঁদের বানিয়ে দেয়া আধুনিকতা আর প্রগতিশীলতার চিন্তা কাঠামোর মধ্যে বসে থেকে ধর্মকে সকল দুর্দশার মুল বলে চিহ্নিত করা। আর তার ফলেই সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে ঝেটিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করা। ইউরোপের ইতিহাস যে আমাদের ইতিহাস নয়, ইউরোপের ধর্ম যে আমাদের ধর্ম নয়, তাই কপি পেস্ট করে ইউরোপের আইডিয়া যে বাংলাদেশে কায়েম করতে চাইলে হবেনা, সেই বুঝ তাঁদের হয়না।
কপি পেস্টের এই পথ আমাদের নয়। এই চিন্তা ফেইল করতে বাধ্য। বাংলাদেশে ৪৬ বছরের স্যেকুলারিজমের পরীক্ষায় স্যেকুলারেরা ফেইল করেছে এখানেই।নতুন রাজনীতি আর বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার পথ খুঁজতে হলে বাংলাদেশে ইসলাম চর্চার অন্যতম ধারা কওমি ধারার সাথেও এনগেইজ হওয়া সবচেয়ে গঠনমূলক কাজ বলে মনে করি। এইটা বলা মাত্রই কার কোথায় জ্বলতেছে সেইটা বুঝতে পারি।

তাঁদের দেওবন্দি লড়াইটা ঐতিহাসিক। সেই বৃটিশ শাসন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইয়ের যে ধারণা কওমি ধারা পোষণ করে এসেছে এবং তাঁদের পুরো জীবনটাই একটা লড়াই হয়ে উঠেছে সেটা আমার বাম ওরিয়েন্টেশন থেকে বুঝার চেষ্টা করি।

মার্ক্সের মতে পৃথিবীর সকল সংগ্রাম যদি শ্রেণী সংগ্রাম হিসেবে হাজির থাকে তবে আজকের দিনে একে চিহ্নিত করা, বোঝা এবং বাস্তবে কী রূপ নিয়ে তার প্রকাশ ঘটছে এর সম্ভাবনা তা নিষ্ঠার সঙ্গে বিশ্লেষণ ও উপলব্ধি করাকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমার মানুষ ফেলে আমি বাইরে কোথায় হাতড়াবো? সে পন্ডশ্রম কী যথেষ্ট হয় নাই!
হেফাজত তাদের ভাষাতে কথা বলে, কার্ল মার্কস কিম্বা লেনিনের ভাষায় বলে না। আমি তাদের ভাষা বুঝতে চাই, কারণ মজলুমের ভাষা বুঝতে পারাই বিপ্লবীর কাজ।
যারা মার্কস পড়েছেন আত্মস্থ করেছেন তাঁদের মজলুমের ভাষা বোঝার ক্ষমতা রাখার কথা। গরিব, খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষ আর শোষিত জনগণ ইসলামের কথাই বলবে, কারন এই ভাষাতেই তারা চিন্তা করতে অভ্যস্ত। এদেশের স্যেকুলার নামী ইসলাম বিদ্বেষী ও বামেরা আসলে কী এচিভ করেছে এ পর্যন্ত? এরা এখনও একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিরুদ্ধে তারা কাজ করে যাচ্ছে। এদের গৌতম ভদ্রকে দিয়ে দেখায়ে দিলেও মজলুমের প্রতিরোধ যে ঈমান রক্ষার লড়াই হিসেবে হাজির হইতে পারে তা বুঝতে চায়না।
আমি থেমিসের বিরোধিতা করেছি,অবশ্যই করেছি। হেফাজতও করেছে। কিন্তু দুই বিরোধিতার মর্ম কি এক? দুই বিরোধিতা কী একই জায়গায় দাঁড়িয়ে? আমাদের সমস্যা হল, এসব বাছবিচার আমল করার সক্ষমতা আমাদের খুবই কম। এই ইস্যুতে আমি অবিবেচক সেকুলারিস্টদেরকে পশ্চিমা সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করে গান গাইতে শুনেছি। এটা পশ্চিমের বর্ণবাদীতার গোলামি।
আমি আমার কথা বলেছি ফিলোসফিক্যালি আর হেফাজত করেছে থিওলজিক্যালি। এই দুই তরফেই যদি থেমিসের অপসারণের এই একই উপসংহারে পৌছায় তাহলে কি এটা ধরে নিতে হবে যে দুই তরফের যুক্তি এক? আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছি এবং বলে যাব।
একইভাবে আমি মডার্নিজমের ক্রিটিক করি ফিলোসফিক্যালি, আর ইসলামপন্থীরা মডার্নিজমের ক্রিটিক করে তাদের থিওলজিক্যাল পয়েন্ট থেকে। দুই তরফের ক্রিটিকও এক নয়। আমার প্ল্যাটফর্ম থিওলজিক্যাল নয় অবশ্যই। আবার কমিউনিস্টদের মত আমি থিওলজিক্যাল আর্গুমেন্ট তুচ্ছও মনে করি না। অবশ্য কমিউনিস্টরা থিওলজি বুঝে কি না সেই প্রশ্ন আছে। আমি থিওলজিস্টদের কথা রিলেট করতে পারি, তাই আমার এক্সেস তৈরি হয়েছে, আমি তাদের কথা বুঝি তাই সহজেই ডায়লগও করতে পারি, তারাও আমাকে বুঝে বলেই আমার ধারণা। যে যার জায়গায় থেকে আমরা পরস্পরকে বুঝি ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। ফলে আমাদের এক সাথে অনেক কিছু করার গড়ার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি। পরস্পরের সাথে গভীর বুঝাবুঝির বন্ধন গড়ার সুযোগ দেখি। এখন এটা দেখে কেউ যদি ঈর্ষা করে এই দায় তার।

বামপন্থীদের বলি, যদি এখনো মনে করে থাকেন ইসলামের প্রশ্নকে পাশ কাটায়ে আপনি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতি নির্মাণ করতে পারবেন, সেটা নিরেট বেকুবি। বেকুবি ছেড়ে জনগণের সঙ্গে সম্বন্ধ ও সম্পর্ক স্থাপন করুন। তাহলে আমার লেখালেখির মর্ম বুঝতে পারবেন, নইলে শাহবাগ থেকে টি এস সি পর্যন্ত যেটুক সর্দারি আছে তাও বেহাত হতে বেশি সময় লাগবে না।

শেষে একটা কথা না বলে পারছি না। যারা নিজেকে বাম সেকুলার বলে দাবি করে দেখি আমার অভিজ্ঞতা বলে ব্যতিক্রম ছাড়া এরা এনলাইটেনমেন্ট বা মর্ডানিজমই বুঝে নাই। পড়ার দরকার মনে করে নাই। সহজেই বাইপাসে কমিউনিস্ট হয়ে গেছে মনে করে। ফলে ডায়লগ আগায় না। এরা থিওলজি বুঝবে কী? সে তো দূর অস্ত! কাউকে ছোট করার জন্য কথাগুলো বলি নাই। আমার দূঃখ আর হতাশার কথা স্বগোতোক্তিতে বললাম।
আমাদের সবার জন্য ভাল কিছু হোক, সবাই পরস্পরের কাজের মর্ম বুঝে, বিভাজনের রাজনীতিকে উৎরে আমরা সবাই ভবিষ্যতের আলোকিত সদর রাস্তায় যেন উঠি এই কামনা করি।

লেখকঃ চিকিৎসক, জনপ্রিয় সমালোচক

মন্তব্য করুন

উপরে