আপনি এখানে
প্রচ্ছদ > ইতিহাস-ঐতিহ্য > আধুনিকায়ন : আমেরিকা ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের অপর নাম?

আধুনিকায়ন : আমেরিকা ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের অপর নাম?


মঈনুল রাকীব:


বেশিদিন আগের কথা না। এই সব মডার্নিজম বা আধুনিকায়ন বলে কিছু ছিলনা। এটা আসে ১৯৪৫ সালের পর পৃথিবীর ক্ষমতা কাঠামোতে দ্বিতীয় দফা বড় ধরনের পরিবর্তনের পর। প্রথম দফা পরিবর্তনের ফলে ১৯১৮ এর পর ওসমানীয় সাম্রাজ্য বাটোয়ারা করে নিয়ে নেয় ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী ফ্র্যান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া। আর এই দ্বিতীয় দফা পরিবর্তনে বিশ্ব ক্ষমতায় চলে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রথম একটি দেশ সরাসরি সাম্রাজ্য পরিচয় না দিয়ে বিশ্ব নয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে। The American Empire! যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে মার্শাল পরিকল্পনার আওতায় পূনর্গঠন করে সে তার ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে চাইলো। এর আগে জাপানে মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্যতম হামলা করে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ত্ব সে প্রকাশ করেছে। এবার অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। ইউরোপকে সে নিজের ক্যাপিট্যালিস্ট বলয়ে ঢেলে সাজায়। আমেরিকার প্রযুক্তি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয় তার নাম Modernism বা আধুনিকতা। মানে আপনি যখন মডার্ণ হওয়ার পক্ষে ফতোয়াবাজি করেন, তা মূলত সহস্র বছর ধরে স্বাবলম্বী প্রাচ্যকে অস্বীকার করে মার্কিন ও ইউরোপীয় পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার বয়ান। এই যে আপনাকে আমাকে ওরা শিল্প শিল্প করায় এর উদ্দেশ্য কি? এর একটাই উদ্দেশ্য। আর তা হচ্ছে আমেরিকা ও তার ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের জন্য বাজার সম্প্রসারণ করা। আপনি যতই ওদের মডার্নিটি নামের ফাঁদে পা দেবেন তত পরনির্ভরশীল হবেন।

আচ্ছা, কখনো ভেবেছেন, ওয়ার্লড ব্যাংক আর আইএমএফ কেন আপনার দেশের পলিসি তৈরিতে ওকালতি করে?কেন চাপ দেয়?কেন হেকেপ আপনাকে উৎপাদনমূখী প্রজেক্ট না দিয়ে পুঁজিবাদী কেরানী হওয়ার প্রজেক্ট দেয়? কেন কৃষির উপর ওরা গুরুত্ত্ব দেয়না?কেন কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে ওরা প্রোপাগান্ডা চালায়?এসবের মূল উদ্দেশ্য আপনার বাজার দখল করা। কেন আপনি নিজের দেশকে পশ্চিমের ভোগবাদী, ক্যাপিট্যালিস্টদের সংজ্ঞানুযায়ী ‘’তৃতীয় বিশ্ব‘ (Third World)  এর দেশ বলেন? আপনাকে বুঝতে হবে, আপনার মাথায় তৃতীয় বিশ্বটাকে প্রবেশ করাতে পারলেই আপনি হীনমন্যতায় ভুগবেন। তখন আমেরিকা হবে আপনার প্রভু, পশ্চিম হবে আপনার মানদন্ড। তখন আপনি আমেরিকান বিস্তারের চটকদার তত্ত্ব গ্লোবা্লাইজেশনের পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি করবেন। কখনো ভেবেছেন একটি দেশ বিশ্বের ১০০ এর অধিক দেশে সামরিক ঘাঁটি করে কেন? এর আর কোন কারণ নেই । আমেরিকা কোন দেশ না, এটি এক নয়া সাম্রাজ্য। এটি আধুনিকায়ন ও গ্লোবালাইজেশনের (Globalization)নামে মার্কিন গুপ্ত সাম্রাজ্যকে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
২।
আধুনিকায়ন (Modernization) কোন মানব কল্যানমুখী তত্ত্ব নয়। গণতন্ত্রও কোনদিন পৃথিবীর নিরঙ্কুশ উত্তম শাসনব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি পায়নি। পশ্চিমা মিডিয়া আপনাকে আমাকে ডেমোক্রেসি গেলায় ওদের নিজস্ব স্বার্থে। কোন একটি দেশে যদি একটি স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা থাকে তাহলে সেটি যেকোন বহি:শত্রুকে নাক গলাতে বাধা প্রদান করে। আমেরিকা এত গণতন্ত্রকামী তো সেখানে দুটির বেশি পার্টি নেই কেন? এই যে পুরুষতন্ত্রের আদলে যে নারীবাদ মডার্নিজম আপনাকে আমাকে গেলাচ্ছে এটা আসলে কি? এটা সম্পূর্ণ কর্পোরেট ফেমিনিজম। এই নারীবাদ শুধু আপনার নিজস্ব সংষ্কৃতি ও বিশ্বাসকে অস্বীকার করে পশ্চিমকে সুপিরিওর হিসেবে বড় বড় কথা বলে। প্রত্যেকটি নারীবাদীকে দেখবেন প্রত্যেকটি বিষয়ের মানদন্ড হিসেবে আমেরকিা ও ইউরোপকে নিয়ে আসবে। এর মানে তারা নিজের অজান্তে প্রাচ্যের চেয়ে পশ্চিমকে সুপিরিওর হিসেবে মেনে নিচ্ছে। অথচ লেভেল অব মডেস্টি (বিনয়ের ধাপ) এবং মানব জীবন যাপন এবং অর্থনীতির দিক বিবেচনায় প্রাচ্য চিরকাল পশ্চিমের চেয়ে উত্তম ছিল। আপনি কখনো দেখেঝেন কোন কথিত নারীবাদীকে মার্কিন ও ন্যাটোর আগ্রাসনের বিরোধীতা করতে? না, তারা তা করেনা। তাদের মূল ইস্যু যেীন ও পোশাকের স্বাধীনতা যা সরাসরি পুঁজিবাদের সাথে জড়িত। আধুনিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ভিকটিম নারী। সেকথা কে বোঝাবে? যে বোঝাতে যাবে তাকে পশ্চিমা সস্তা পুঁজিবাদী স্কেলে মধ্যযুগীয় অথবা অনাধুনিক করে দেবে। আচ্‌ছা যুদ্ধ কি নারীকে হ্ত্যা করেনা? একটি বোমা যখন সিরিয়ায়, আফগানিস্তানে, ইরাকে, ফিলিস্তিনে, ভিয়েতনামে, ইউক্রেনে, আফ্রিকায় পশ্চিমারা (ইউরোপ ও আমেরিকা এবং তাদের মিত্র) ফেলে তখন কি তাতে কেবল পুরুষ মরে যায়? নাকি নারীও মরে? নারীবাদ তাহলে এই যুদ্ধের ব্যাপারে নিরব কেন? বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভুদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার অনুমতি নেই?
৩।
কথিত আধুনিকায়ন আমাদের দাসত্ত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করছে। আমেরিকা ও ইউরোপীয় দাসত্ত্ব। আপনি চিন্তাও করতে পারবেননা মডার্নিজমের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব সংষ্কৃতি ও বিশ্বাস এবং অর্থনীতিকে কিভাবে ওরা করায়াত্ত্ব করে নিচ্ছে। সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়ে আমাদের জ্বালানীকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। মনে রাখবেন, আমাদের দেশের পশ্চিমা দালালদের (ডেনিয়েল লার্নার প্রখ্যাত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তাত্ত্বিক। তিনি তার পুস্তকে আমেরিকার বাইরে আমেরিকার স্বার্থে যারা কথা বলে সেই শ্রেণীকে আদর করে চেইঞ্জ এজেন্ট নাম দিয়েছেন। সোজা বাংলায় আমেরিকান ভাবদর্শ মেনে পরিবর্তন আনয়নকারী দালাল। বিদেশ থেকে ডিত্রি নিয়ে আসা লোকগুলো এবং মিডিয়ার ক্যাপিট্যালিস্ট প্রভৃতিরা এই দলে পড়ে।)মাধ্যমে ওরা জাতীয়তাবাদকে সংকীর্ণ হিসেবে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে অথচ পশ্চিমের প্রত্যেকটি দেশই কিন্তু তীব্র জাতীয়তাবাদী। ফ্র্যান্স ইংরেজি ব্যবহার করেনা, জার্মানী ও্ রাশিয়াও তাই। এমন কি ইউরোপের পো্ল্যান্ড , বুলগেরিয়া, সুইডেনের মত রাষ্ট্রগুলোও ইংরেজিকে ব্যবহার করেনা। তবে আমাকে আপনাকে ইংরেজি ব্যবহারে ওরা বাধ্য করে এটা বলে যে, ইংরেজি ছাড়া দুনিয়া চলেনা। এর মানে আর কিছুনা, আপনাকে পশ্চিমা দাস বানানো। ভাষা চিরকাল আগ্রাসনের গুরুত্ত্বপূর্ণ অংশ। ওরা নিজেরা জাতীয়তাবাদী হয়ে নিজেদের পণ্য পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে আন্তর্জাতিকতাবাদ (Internationalism) নামের সাম্রাজ্যবাদী তত্ব আপনাকে আমাকে খাওয়ায়। আমরা তা কাচুমাচু করে খেয়ে বলি ‘বিদেশী পোষাক, তত্ত্ব ও পণ্য ভাল। দেশেরটা ভাল না । দেশ নিয়ে পড়ে থাকা সংকীর্ণতা।’ আর ওদিকে ওরা ঠিকই ওদের দেশ নিয়ে পড়ে থাকে। এমন কি দেশের স্বার্থে ব্রিটেন ফার্সট বা আমেরিকা ফার্স্ট প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়। আমাদের শ্রমিকদের কম দামে কেনে এবং আমাদের জাতীয়তাবোধহীন মেধাগুলোকে নামমাত্র বৃত্তি দিয়ে কিনে নিয়ে যায়।

৪।
যা বলছিলাম, ১৯৪৫ সালের পর আমিরকা যেভাবে তাত্ত্বিক জগত গড়ে তুলেছিল তা এখন প্রাকটিক্যালি সত্য হতে যাচ্ছে। পশ্চিমা মিডিয়া এর অন্যতম অনুঘটক। কখনো আপনি ভেবেছেন যে কেন আপনার ঘরের ব্যাপারে আমেরিকা ও ইউরোপ চিন্তিত থাকে? স্বার্থ ছাড়া? কখনোই না। পুঁজিবাদ স্বার্থ ছাড়া চ্যারিটও করেনা। ওরা মডার্নিজমের মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধকে নষ্ট করেছে। এর সবকিছু করেছে আপনার মনের উপর কর্তৃত্ত্ব করার জন্য। ওরা জাতিসংঘ বানয়েছে। সেটি বিশ্বের নানা বৈষম্য নিয়ে কথা বলে অথচ নিরাপত্তা পরিষদে ধ্রুব ৫টি রাষ্ট্র থাকাই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈষম্যগুলোর একটি। সেটি ওরা আপনাকে আমাকে বুঝতে দিচ্ছেনা। পাড়ার মাস্তানদের মত ওরা পৃথিবীকে বাটোয়ারা করে নিয়ে মাস্তানী করছে, ছিনতাই করছে। মিঠা কথা শুনিয়ে, এনজিও নামের সিভিল গোয়েন্দা পাঠিয়ে, মিডিয়ার মাধ্যমে ওরা আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভেীমত্ত্ব, চিন্তাকে লুটে নিচ্ছে। এটা মানা যায়না। কিছুতেই মানা যায়না। এই মডার্নিজম কখনোই পৃথিবীকে শান্তি এনে দিতে পারেনি। এনেছে অ্স্ত্র, দখলদারিত্ত্ব, আগ্রাসন, বর্ণবাদ, বিশ্বায়ন নামের সাম্রাজ্যবাদ, অসম প্রতিযোগিতা। আর পুঁজিবাদী আধুনিকতা পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ও ক্ষমতা দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশের হাতে তুলে দিয়েছে। আমাদের সবার জীবনকে সিস্টেম নামের সিস্টেমেটিক জালে বদ্ধ করেছে। আমরা ওদের ক্যামেরা, ওদের বায়োমেট্রিক, ওদের স্যাটেলাইট, ওদের ড্রোনের আওতায় বাস করে ভাবি,
বাহ!আমরা কত্ত আধুনিক!
এতই আধুনিক যে আমাদের অতীতের নিজস্ব সব কিছুকে ওরা প্রত্যাখ্যান করেছে, তাতে আমাদের কিছু যায় আসেনা। অথচ আমরা যখন পানাম নগন গড়েছি ওরা তখন গুহায় বাস করে। আমরা যখন উয়ানী বটেশ্বরে বা মহাস্থান গড়ে সাম্রাজ্য গড়েছি ওরা তখন পৃথিবীর মানচিত্রে নেই। আমাদের আর্যভট্র যখন অঙ্ক কষেছে ওরা তখন যাযাবরের মত না খেয়ে বরফের তলায় বাস করেছে। আমাদের হাছন-লালন যখন দর্শন দিয়েছে তখন ওরা পরস্পরকে হত্যায় ব্যস্ত। আর প্রাচ্যের মধ্য অংশ যেমন মিশর, ইরাক, সিরিয়া বা ইরানের কথা কিংবা দূরপ্রাচ্যের চীন, ইন্দোনেশিয়া বা মঙ্গোলিয়ার কথা নাই বললাম। পৃথিবীর সভ্যতায় ৯০ শতাংশ সৃজনশীলতা প্রাচ্যের। আর আজ ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক শক্তির জোরে তা ভুলিয়ে দিতে চায় পশ্চিম। আপনার হাঁচি দেয়া থেকে শুরু করে খাওয়া, চিন্তার সীমা এমনকি সন্তান উৎপাদনের পরিমাণও ওরা ঠিক করার প্রজ্ঞাপন জারি করে! আপনি খুশীতে হাত তালি দেন। ‘প্রভু কহিছে, অতএব উহাই সত্য।’
৫।
প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির (Imperialist Power) একেকটি ইউনিক শক্তি থাকে যখন তা অন্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। পারস্য সাম্রাজ্য সামরিক ও আর্টিস্টিক দিক দিয়ে ভাল ছিল, মঙ্গলরা ছিল বর্বর ও শিক্ষার প্রতি কম অনুরাগী, তুর্কি সাম্রাজ্য তাদের সাহস ও ইসলামের শক্তিকে কাজে লাগায়, রাশিয়ান সাম্রাজ্য বরফাবৃত অংশে থাকায় নিরাপদ ছিল, বাংলাদেশের প্রাচীন যতগুলো সাম্রাজ্য ছিল তার সবগুলোই এই ভূখন্ডের উর্বর জমি ও নদী ও সমুদ্রকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিল ইত্যাদি। তাহলে আমেরিকা কি করছে? আমেরিকা সিম্পলি টেকনোলজি ও টেকনোমেধার উপর কন্ট্রোল করেছে। ফলে এই সাম্রাজ্য নিয়ে যারা প্রতিবাদ করার কথা ছিল তারাই এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যেতে উদগ্রিব থাকে। আমেরিকা প্রতিটি চিন্তাকে ডিকনস্ট্রাক্ট করে নয়া চিন্তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রত্যেকের মধ্যে কনফ্লিক্ট তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। যারাই এই ষড়যন্ত্রকে বুঝে ফেলে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়েছে তারা সি্‌আইএ এর সিক্রেট কিলিং মিশনের স্বীকার হয়েছে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে সেীদি বাদশাহ ফয়সাল, বিপ্লবী চে গেভারা, সর্বশেষ ইরাকের সাদ্দাম, লিবিয়ার গাদ্দাফি প্রমুখ এর স্বীকার।

এখনো এই কথিত পশ্চিমাকরণ প্রকল্প মডার্ণাইজেশ গ্রহণ না করা উত্তর কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ, ককেসাস ও আফ্রিকাকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে। আমি আপনি আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের কথামত কাউকে তৃতীয় বিশ্ব বলি, কাউকে উন্নত। অথচ এগুলোর কোন বিশ্বজনীণ সংজ্ঞায়ন নেই। অর্থের বিবেচনায় ধাপ নির্ণয় হবে কেন শুধু? ওরা আমাদের মন কন্ট্রোল করছে। মিডিয়া ওদের সাম্রাজ্যের প্রচারমাধ্যম, আমরা ওদের অডিয়েন্স নামধারী প্রজা। প্রজাদের ওরা শোষণ করে, তাদের উপর নিয়ম চাপায় দেয়, প্রজাদের ঘরের অভ্যন্তুরে নাক গলায়। সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের উপর রাশিয়া ও বাশার আল আসাদ হামলা চালালে মার্কিন মিডিয়া সংবাদ করে ‘বেসামরিক মানুষ মরে’, কিন্তু ইরাকে আবার নিজেরা মারলেও কিছু লেখেনা। তারা নিজেরা পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করবে, সেটি পৃথিবীর জন্য হুমকি নয়। এমন কি অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাঈল পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রের বৃহৎ ভাণ্ডার গড়ে তুললেও তাদের কোন চিন্তা নেই। কিন্তু নিজেদের প্রভাব বলয়ের বাইরের উত্তর কোরীয়া করলে তাদের মাথা ব্যথা। এইটা কোন নিয়ম যে, একটি রাষ্ট্র অস্ত্র বানাবে না পারমাণবিক চুল্লী বানিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে তা ঠিক করে দেবে আরেকটি রাষ্ট্র। এর নাম সাম্রাজ্যবাদ। নিজের প্রভুত্ত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিজের সমান অস্ত্র অন্য কোন শক্তির কাছে থাকা ওরা চায়না। কখনো ভেবেছেন ব্রাজিল বা ভারতের একটি প্রদেশের সমান ফ্রান্স বা ব্রিটেন, অথচ তারা নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, কিন্তু ব্রাজিল বা ভারত নয়। কেন? কখনো ভেবেছেন বিশ্বের অর্ধেক মানুষ প্রায় যে ধর্মের অনুসারী সেই মুসলমানদের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য করা হয়নি। কখনো ভেবেছেন পুরা আফ্রিকা মহাদেশের কেউই নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ মোড়লের সদস্য নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে চীনকে বাদ দেয়া যায়নি। তা না হলে চীনকেও বাদ দিয়ে দিতো।

মার্কিন এই সাম্রাজ্যের প্রোপাগাণ্ডা মেশিন হচ্ছে সিএনএন, নিউইয়কূ টাইমস, ফক্স নিউজ, এনবিসি, বিবিসি, ডয়েচে ভেলে, টাইম, অস্কার, হলিউড আর জাতিসংঘ নামের নপুংশক সংগঠন যেটির মহাসচিব নিন্দা বা প্রশংসা কোনটি করবে তা লিখে দেয় হোয়াইট হাউজ থেকে। রথচাইল্ড বা রকফেলার পরিবারের জায়নবাদী প্রকল্পে ইসরাঈল পৃথিবীর ক্ষমতার শীর্ষে আরোহনের পূর্বাবস্থা হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। যখন নিজের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে আমেরিকান সাম্রাজ্যের দোসরদের সংজ্ঞায়নে আপনি অস্বীকার করেন বা যুগের অনুপোযোগী ভাবেন তখন আপনি মার্কিন সাম্রাজ্যের দাসত্ত্ব করেন। যেভাবে সবুজ বিপ্লবরে নামে বাংলার কৃষিকে ধ্বংস করে, আউশ, আমন, বোরো নষ্ট করে হাইব্রিডে মেতে জীবনীশক্তি ধ্বংস করা হয়েছিল কৃষির সেভাবে বৃদ্ধিবৃত্তিক ধ্বংসযজ্ঞও ওরা চালিয়ে যাচ্ছে। সেটি বুঝতে দেরি হচ্ছে আর কি!  কি নিজেকে আমেরিকা ও ইউরোপীয় নয়া সাম্রাজ্যের প্রজা ভাবতে ভাল লাগেনা?

নিজেকে পশ্চিমের দেয়া মানদণ্ডে আধুনিক, গ্লোবালাইজড, ইন্ডাস্ট্রিলাইজড, আরবানাইজড তথা মডার্ণাইজড ভেবে গর্ব করার অপর নাম আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের দাস হয়ে গর্ব করা। আপনি গর্বিত আছেন তো?

লেখক: উপসম্পাদক, প্রাচ্যনিউজ ডটকম।

মন্তব্য করুন

উপরে